সপ্তদশ বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির নির্বাচনী ‘গিমিক’





            দীপেন্দু চৌধুরী

 স্বাধীনতা উত্তর ভারতবর্ষে রাজনীতির চাকা যত গড়িয়েছে, রাজনীতিবিদরা ততই রাজনৈতিক প্রকৌশলে দড় হয়ে উঠেছেন। সাধারণ নির্বাচন হোক অথবা রাজ্য বিধানসভা নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক দলগুলি গুচ্ছ গুচ্ছ প্রতিশ্রুতির ঝুড়ি নিয়ে মানুষের দরবারে হাজির হয়ে যায়। আমাদের রাজ্যের সপ্তদশ নির্বাচনের ভোট পর্ব শুরু হয়ে গেছে। কিছুদিন আগে বিজেপি নিজেদের দলের সোনার বাংলার সংকল্প পত্র নামে একটি ইস্তেহার প্রকাশ করেছে। যাতে আছে অবাস্তব আকাশ ছোয়া কিছু প্রতিশ্রুতি। সমসাময়িক সময়ে বিজেপি দলের কেন্দ্রীয় নেতা তথা দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বহুল প্রচারিত একটি বাংলা নিউজ চ্যানেলের সিনিয়র ভি পিকে একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠন করলে সমস্ত মাধ্যমের বিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করবে। উচ্চ শিক্ষা অর্থাৎ ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিক্যালেও বাংলা ভাষায় শিক্ষা ব্যবস্থা পাঠ্যক্রমের প্রচলন করবে বিজেপিতারা সরকার গঠন করলে, উপযুক্ত পাঠ্যপুস্তক রচনা করবে

যে সঞ্চালক তথা সিনিয়র ভিপি সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলেন তিনি অবশ্য সাহস করে প্রশ্ন করেননি যে বিজেপি গত ২০ বছর গুজরাটে ক্ষমতায় আছে, ওই রাজ্যে কি ইঞ্জি নিয়ারিং ও মেডিক্যাল শিক্ষা গুজরাটি ভাষায় হয়? অন্যান্য বিজেপি শাসিত রাজ্যে এই বিষয়ে খবর কী? 

প্রথম প্রশ্ন কেন্দ্রের যে ত্রি-ভাষা নীতি আছে সেই নীতি অনুসরণ করে রাজ্যসরকারগুলির শিক্ষা দফতর চলে। যেমন সর্বভারতীয় শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ইংরেজি এবং হিন্দিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। আঞ্চলিক স্তরে যে রাজ্যের ভাষা প্রধান ভাষা হিসেবে স্বীকৃত সেই ভাষায় ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনা করে থাকে। আমাদের রাজ্যে যেমন বাংলা ভাষা। সঙ্গে সুযোগ দেওয়া হয়েছে আদিবাসী সম্প্রদায়ের কথা মাথায় রেখে সাঁওতালি ভাষা (অলচিকি লিপি), নেপালী ভাষা এবং উর্দু ভাষাকেবাংলা ভাষায় শিক্ষা ব্যবস্থার পাঠ্যক্রম প্রচলন করলে আগের ব্যবস্থা আর থাকবে না। রাজ্যের অবাঙ্গালি ছাত্রছাত্রীদের কথা না ভেবে শুধুমাত্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছেন অমিত শাহ। বোঝাই যাচ্ছে, বাংলা অন্যান্য জনগোষ্ঠীগুলির ভাষা যেমন নেপালী, সাঁওতালি, এবং এক অংশ সংখ্যালঘুদের ভাষা উর্দু ও হিন্দি ভাষার বিদ্যালয়ের ওপর থেকে বাংলা ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার কথা বলে সস্তা চটকদারী জনপ্রিয়তা চাইছে বিজেপি।

বিজেপির দাবি সপ্তদশ বিধানসভা নির্বাচনে দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করলে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করবে। বাংলার বিদ্বজ্জনেদের কাছে প্রথমেই প্রশ্ন উঠছে, হঠাৎ করে বিজেপি নেতা অমিত শাহ এই পরিকল্পনার কথা টিভি সাক্ষাৎকারে কেন বললেন? দলের ইস্তেহারে যে বিষয়টাকে রাখা হয়নি। তার মানে এটা গোপন অ্যাজেন্ডা।

অষ্টাদশ শতাব্দী থেকেই সংস্কৃত ভাষার খরস্রোতা শাখা নদী হিসেবে বাংলা ভাষা নিজস্ব ঘরানা তৈরি করে নিয়েছে। তৎভব, তৎসম ভাষা হয়ে বর্তমান চলিত আধুনিক ভাষা। যে ভাষায় গদ্য লিখে গেছেন রাজা রামমোহন রায়, পণ্ডিত বিদ্যাসাগর, কালীপ্রসন্ন সিংহ, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ গুণিজনেরা।  

পরবর্তীতে বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর, মানিক, বনফুল, শঙ্কর, সমরেশ বসু, সমরেশ মজুমদার এবং সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সহ আরও অনেকে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ দাশ, শঙ্খ ঘোষ, বিষ্ণু দে, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং জয় গোস্বামী, সুবোধ সরকাররা বাংলা ভাষায় কবিতা লিখে প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন। বাংলা সাহিত্যের উল্লেখিত বরেণ্য কথা সাহিত্যিক, কবিরা বাংলা ভাষায় লিখে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পরিচিতি লাভ করেছেন। অমিত শাহের ঘোষণায় তাই খটকা লাগে। বিষয়টা ইস্তেহারে রাখা হয়নি অথচ আলাদাভবে নিউজ চ্যানেলের সাক্ষাৎকারে তিনি উল্লেখ করছেন। আগের অধ্যায়েই আমরা জানালাম বাংলা ভাষাকে বিজেপি সরকার ‘ধ্রপদী’ ভাষার তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে। নির্বাচন শেষ হতে  এখনও একমাস বাকি। তার আগে আমাদের একবার দেখে নিতে হবে পাঁচ বছর আগে অসমের নির্বাচনে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বিজেপি কতটা রাখতে পেরেছে?

গত পাঁচ বছরে বিজেপি শাসিত অসমে বাংলা ভাষা এবং বাঙালিদের উপর সব রকমের আক্রমণ নেমে এসেছে। বিজেপি অসম বিধানসভায় শাসকের আসনে বসেই বাংলা মাধ্যমের শিক্ষা ব্যবস্থাকে গঙ্গা যাত্রার প্রায় সব ব্যবস্থাই পাকা করে ফেলেছে। অসম বিধানসভায় অধিবেশন চলাকালীন বাংলা ভাষায় কোনও প্রশ্ন করা যায় না বিজেপির শাসনকালে। যে ব্যবস্থা স্বাধীনতার পর থেকেই চালু ছিল। ‘সপ্তাহ’ পত্রিকার ২৬ ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় একটি নিবন্ধে পারিজাত আনন্দ ঘোষ লিখেছেন, ‘এই বিজেপি সরকারের শাসনে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে সব ভাষা দিয়ে ‘ভাষাবৃক্ষ’ বানানো হলেও ‘’বাংলা’’ ভাষাকে ইচ্ছাকৃত ভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। এই বিজেপি শাসনে ‘’বাংলা’’ ছাড়া সকল ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতির উন্নয়নের জন্য ফান্ড বরাদ্দ করা হয়েছে।‘’ একটি সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে, অসমের ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা এবং বরাক উপত্যকায় সর্বমোট হিন্দু বাঙালির সংখ্যা ৫৫-৬০ লাখ। বাংলা ভাষার উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০১৬ বিধানসভা নির্বাচনে এই অঞ্চলের ৭০ শতাংশ বাঙালি ভোট বিজেপি নিজেদের ঝুলিতে পুড়েছেকিন্তু সরকার গঠনের পরে এই প্রতশ্রুতির কথা সম্পূর্ণ ভুলে মেরে দিয়েছেন বিজেপি নেতৃত্ব গত পাঁচ বছরে অসমের বাঙালিদের জন্য বিজেপি সরকার কোনও উন্নয়ন করেনি। নির্বাচনী রাজনীতির মোড়কে ‘বোড়ো’ ভাষাকে দ্বিতীয় সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে অসম সরকার। অথচ মাত্র ১২-১৪ লাখ ভাষাভাষী মানুষের ভাষা ‘বোড়ো’ ভাষা। ঐতিহ্যবাহী ‘বাংলা’ ভাষাকে অসমে দুয়োরানী করে রেখে দেওয়া হয়েছে। অসমে বাঙালি জীবন জীবীকার নিরাপত্তা নেই। তবুও অসমের বাঙালি নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি, কৃষ্টি বাঁচিয়ে রাখতে আজও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।   

বাংলার চা বাগান শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর ‘জুমলা’ প্রতিশ্রুতি

পশ্চিমবঙ্গের সপ্তদশ নির্বাচনের ইস্তাহারে ‘এবার আঞ্চলিক উন্নয়ন এবার বেজেপি’ উপ-শিরোনামে বিজেপি ঘোষণা করেছে,  ১) উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন বোর্ড গঠন ২) পর্জা পাট্টা অধিকার দেওয়া হবে চা বাগান ও অন্যান্য অঞ্চলের বাসিন্দাদের ৩) চা বাগান শ্রমিকদের প্রতিদিনের মজুরি বেড়ে ৩৫০ টাকা হবে। বিরোধী দলগুলির কাছে বিজেপির  ‘মারীচপত্র’-এর ঘোষণা  ‘জুমলা’ বলেই মনে হয়েছে। যেটাকে নির্বাচনী ‘গিমিক’-র সঙ্গে তুলনা করা চলে। আমাদের সামনে উদাহারণ আবারও সেই অসম। তথ্য বলছে, অসমে ৮৫০ টি বড় চা বাগান আছে। এখানে প্রায় সাড়ে দশ লক্ষ শ্রমিক কাজ করেন। ২০১৬ সালের অসম বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, চা জনগোষ্ঠীকে অনুসূচিত জাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেবে। এবং চা শ্রমিদের দৈনিক মজুরি ৩৫১ টাকা করে দেওয়া হবে। না পাঁচবছর সরকার চালিয়েও বিজেপি নামক ‘হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান’ মতাদর্শে বিশ্বাসী দল অসমের চা শ্রমিকদের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কোনও কিছুই করেনি। ফল দাঁড়িয়েছে, এবারের নির্বাচনের আগে অসমের চাশ্রমিকরা ক্ষোভে ফুটছে। এই বিষয়ে কমলেশ গুপ্ত ২৬ মার্চের ‘সপ্তাহ’ পত্রিকায় একটি নিবন্ধে বিস্তারিত লিখেছেন। আগ্রহী পাঠক মনে করলে পড়ে নিতে পারেন।

বাংলা ভাষা, বাঙালি এবং পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিকে সামনে রেখে বিজেপি কি মূলত বাঙালি সভ্যতাকে সহজ টার্গেট বলে মনে করছে? বাংলা ভাষা, বাঙালি সভ্যতার চিরায়ত সংস্কৃতির উপর বিন্দুমাত্র আক্রমণ বৃহত্তর বাঙালি সমাজ মেনে নেবে না। সময় আসলে সময় মত উত্তর দেওয়ার জন্য বৃহত্তর বাংলা ভাষাভাষী জাতিগোষ্ঠী প্রতিবেশি জনজাতি গোষ্ঠীগুলিকে সঙ্গে নিয়েই এই ‘ছদ্ম হিন্দুত্ব’ নামক এক ভয়ংকর শক্তির আক্রমণের জবাব দেওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে। ভবিষ্যতের গর্ভে যার উত্তর লুকিয়ে আছে।             

 

Comments

Popular posts from this blog

দু’জন বাঙালি বিঞ্জানীর গণিতিক পদার্থ বিঞ্জানে বিশ্ব বিখ্যাত আবিষ্কার

মধ্যরাতের স্বাধীনতা ও আহত বিবেক

World Bank is ready to help West Bengal government For tackle air pollution