সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধানোটা দুই সম্প্রদায়ের নির্বুদ্ধিতা


দীপেন্দু চৌধুরী 

তিনি সেই ব্যক্তি, ভারতের স্বাধীনতা পূর্ব এবং উত্তর দুটো সময় ধরে আজও উজ্জ্বল নক্ষত্র। উজ্জ্বল ব্যক্তি। শুধু নক্ষত্র বললে কম বলা হয়। একজন মানবতাবাদী মানুষ। উত্তর সোভিয়েত সমাজতন্ত্র, উত্তর লঙমার্চ, বার্লিন প্রাচীরের পতন, উত্তর বিশ্বায়ন, উদার অর্থনীতি, সমাজতান্ত্রিক বাজার অর্থনীতি এবং করোনা আবহ। সমস্ত কালে তিনি আছেন এবং থেকে গেলেন এমনই একজন চিন্তাবিদ তথা রাজনীতিবিদ হিসেবে। তাঁর প্রয়াণের ৭৩ বছর পরেও তিনি সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। আমরা মহাত্মা গাঁধির কথা বলছি। অন্নদাশঙ্কর রায় তাঁর গাঁধি বইয়ে লিখছেন, প্রথমে তিনি গাঁধি ভক্ত, পরে গাঁধি সমালোচক অনেকটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো। এবং শেষে অন্নদাশঙ্কর বলছেন, আমাকে গাঁধির কাছেই ফিরে আসতে হল। 

সম্প্রতি কলকাতায়গাঁধি ও বাংলা সাহিত্যবিষয়ক একটি আলোচনা সভা হয়ে গেল। সাহিত্য একাডেমী আয়োজিত এই মনোঞ্জ অনুষ্ঠানটি ছিল ২৫ মার্চ। অনুষ্ঠানের স্বাগত ভাষণেই সাহিত্য অকাদেমি সচিব কে শ্রীনিবাস রাও সুরটা বেঁধে দিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন, রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে তারাশঙ্কর, মানিক, সতীনাথ ভাদুড়ি, বনফুল প্রায় প্রতিটি দিকপাল বাংলা সাহিত্যিকের লেখায় গাঁধি এসেছেন। যে কথা সমর্থন করে কবি সুবোধ সরকার বলেন, ‘’গাঁধি কে ছিলেন সেটা ঢোঁড়াই ভালো উত্তর দিতে পারে। রাম চরিত মানসকে অবলম্বন করে সতীনাথ ভাদুড়ি লিখেছিলেন ঢোঁড়াই চরিত মানস।গাঁধি বাবাকে? একটা মেঝেতে ঘুমোন। পায়ে জুতো নেই তিনি হচ্ছেন মহাত্মা গাঁধি। বলছেন প্রখ্যাত ফরাসি দার্শনিক রোমা রঁলা। অসমিয়া লেখক বীরেন্দ্র ভট্টাচার্য  গাঁধিকে নিয়েমৃত্যুঞ্জয়নামে উপন্যাস লিখেছেন। কবি জীবনানন্দ দাশ গাঁধিকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন। আজ ঢোঁড়াই হয়ত নেই কিন্তু অসংখ্য সাব-অলটার্ন চরিত্র সাহিত্যে ছড়িয়ে আছে।‘’  

সুবোধ সরকার প্রশ্ন তোলেন, আমেরিকা কি করে নন ভায়োলেন্সের কথা বলছে? যে আমেরিকা দেশের প্রত্যেক নাগরিকের বাড়িতে বন্দুক রাখতে অনুমতি দিচ্ছে। লাইসেন্স দিচ্ছে। সেই আমেরিকা অহিংসার কথা বলছে? মার্টিন লুথার কিংসের জন্য? সুবোধ আক্ষেপ করেন, অগ্রজ প্রবীণ লেখক মঞ্চে বসে থাকা শংকরকে নিয়ে। সম্প্রতি সাহিত্য অকাদেমি তাঁকে পুরস্কৃত করেছেন তাঁর আত্মজীবনীএকা একা একাশিস্মৃতিকথা বইয়ের জন্য। সুবোধ সরকার বলেন, আজ প্রথম সাহিত্য অকাদেমি সভাঘরে বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় লেখক শংকর তথা মনিশংকর মুখোপাধ্যায় আছেন। তাঁরকত অজানারেউপন্যাস, চৌরঙ্গী, জনঅরন্য, সীমাবদ্ধ এতগুলি উপন্যাস বাংলা সাহিত্য পেলেও সাহিত্য অকাদেমি তিনি পাননি। এতদিন পরে পেলেন এটা আমাদের ভাবায়। 

এর পরেই বক্তা ছিলেন শংকর নিজে। তিনি বলেন, ‘’আমার প্রথম সাহিত্য অকাদেমি পুরষ্কার জীবনে প্রথম। খুব ভালো লাগছে। আমার জীবনে প্রথম লেখা ছিল খাদি এবং গাঁধিকে নিয়ে। সেটা ছিল একটা গল্প। তখন আমার বয়স মাত্র ১২ বছর। প্রায় প্রত্যেকটা বাঙালি লেখকের উপর গাঁধির প্রভাব রয়েছে। গুজরাটে প্রথম সফরে গিয়ে আমি সাংবাদিকদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম। সবরমতী এবং ভাগীরথীর মধ্যে কি পার্থক্য আছে? গাঁধির মধ্যে ছিলসিক্রেট অব দ্য ব্রাদারহুডতিনি এমন একজন ব্যক্তি সব সময় নিজের ভুল স্বীকার করতেন। সত্যের জন্য লড়াই করেছেন। গাঁধি তাঁর সচিব নির্মল কুমার বসুকে বলেছিলেন, ‘আমার জীবনই আমার বানী‘’ প্রবীণ লেখক শংকর আমাদের মনে করিয়ে দিলেন, বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ নায়ক গাঁধি। আমাদের সময়ের বিখ্যাত ব্যক্তি তিনি। 

রবীন্দ্রভারতীর উপাচার্য অধ্যাপক সবসাচী বসু রায়চৌধুরী বলেন, ‘’গাঁধিজীর সম্পর্ক ছিল তৎকালীন বাংলার সমসাময়িক সমস্ত বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে। ১৯২০ সালে রবীন্দ্রনাথ বলছেন, ‘মহাত্মা গাঁধির স্বীকৃতি সমস্ত দেশে স্বীকৃত হইয়াছে। কোন গাঁধিকে খুঁজছি আমরা তাঁর প্রয়াণের ৭৩ বছর পরে? তিনি আজও প্রাসঙ্গিক। তাঁর চলার পথকে আমাদের বেয়ে চলা উচিত।‘’ অধ্যাপক রায়চৌধুরী গাঁধি এবং রবীন্দ্রনাথের পারস্পরিক সম্পর্ক বিষয়ে বলেন, দুজনের মধ্যে মতপার্থক্য হলেও মনান্তর হয়নি। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক, প্রাবন্ধিক বিশ্বজিৎ রায় বলেন, ‘’বিগত ১০-১৫ বছরে গাঁধিকে নিয়ে বাংলা ভাষায় মৌলিক প্রবন্ধ লেখা হয়নি। ইংরেজি ভাষায় নতুন করে লেখা হচ্ছে। গাঁধিকে নিয়ে বিস্তৃত অনুসন্ধান হচ্ছে। ইংরেজিতে যেমন দীপেশ চক্রবর্তী, রামচন্দ্র গুহ এবং আরও অনেকে ভালো কাজ করছেন। বাংলা সাহিত্যে গাঁধির প্রভাব সম্পর্কে বলব, গাঁধি তাঁর জীবৎকালেই বাংলার শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকের আগ্রহ তৈরি করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ গাঁধিকে জিশুর সঙ্গেও তুলনা করেন। রবীন্দ্রনাথ থেকে অম্লান দত্ত পর্যন্ত গাঁধিকে দ্বান্দিকভাবে দেখেছেন।‘’ 

কবি সৈয়দ হাসমত জালাল গাঁধির শিক্ষা ভাবনা প্রসঙ্গে বলেন। তিনি বলেন, ‘’গাঁধির সাম্রদায়িক দাঙ্গা বিরোধী অবস্থান, হরিজনদের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য নিয়ে আমরা বেশি আলোচনা করি। কিন্তু তাঁর শিক্ষা ভাবনা প্রসঙ্গে আমরা কম কথা বলি। রবীন্দ্রনাথ এবং গাঁধির মতাদর্শের মধ্যে বিপুল পার্থক্য। অথচ রবীন্দ্রনাথ এবং গাঁধির শিক্ষা ভাবনায় অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। গাঁধির শিক্ষা ভাবনা সার্বিক মানুষ গড়ে তোলে। একজন কেরানী তৈরি করে না। গাঁধির শিক্ষা ভাবনায় পরিবেশ চিন্তা আজও প্রাসঙ্গিক। যেমন সাফাই অভিযান।‘’ 

গাঁধি ও বাংলা সাহিত্য বিষয়ে নিবন্ধ পড়েন প্রাবন্ধিক হিমবন্ত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সাংবাদিক-লেখক শীর্ষ বন্দ্যোপাধায়। হিমবন্ত মূলত সতীনাথেরঢোঁড়াই চরিত মানসউপন্যাস এবং গাঁধিকে বিষয় করে বিস্তারিত বক্তব্য রাখেন। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি স্বীকার করেন, ঢোঁড়াই চরিত মানস নামক কালজয়ী উপন্যাসের পর বাংলা সাহিত্যে আমরা আর এই মানের ধ্রুপদী সাহিত্য পাইনি। সাংবাদিক-লেখক শীর্ষ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর লিখিত বক্তব্যে তুলে ধরেন বিভিন্ন লেখকের গল্প উপন্যাসে গাঁধির উপস্থিতি। তিনি উল্লেখ করেন বনফুলের একটি গল্পের। যে গল্পে একজন দর্জি স্থানীয় নেতাদের দাবিতে গাঁধিকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য ৫০ টি তিরঙা পতাকা জরুরি ভিত্তিতে সেলাই করে দেন। কারণ গাঁধিজী ট্রেনে করে যাবেন। তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে হবে। বনফুল একই গল্পে প্রসঙ্গ এনেছেন সেই দর্জি ওই নেতাদের ধমকে আবার জরুরি ভিত্তিতে ৫০ টি পতাকা সেলাই করে দিতে বাধ্য হন। তবে এবার তিরঙা নয় কালো পতাকা। এবারেও গাধিজী আসবেন তাঁকে কালো পতাকা দেখাবেন ওই অঞ্চলের এক সময়ের গাঁধি সমর্থকরা। এক সাংবাদিক শীর্ষের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, কি এমন সামাজিক পরিবর্তন হল এক সময়ের গাঁধিবাদী নেতৃত্ব তাদের নেতাকে কালো পতাকা দেখাচ্ছে। শীর্ষ বিতর্কে না ঢুকে উত্তর দিলেন বনফুল পরিবর্তিত সময়কে নিজের গল্পে ধরতে চেয়েছেন। আমরা সাহিত্যে গাঁধিকে কি ভাবে পাচ্ছি সেটাই আমি তুলে ধরতে চেয়েছি।  

প্রধান বক্তা হিসেবে এদিনের আলোচনাসভায় এসেছিলেন ইতিহাসবিদ সুগত বসু। তিনি প্রথমেই আত্মসমালোচনার সুরে বলেন, আজকের এই সাহিত্য সভায় মহাত্মা গাঁধিকে নিয়ে বলার জ্ন্য আমাকে আমন্ত্রণ জানান হয়েছে। আমি এর জন্য গর্বিত। কিন্তু প্রথমেই স্বীকার করে নিতে হচ্ছে আমি একজন ইতিহাসবিদ, আমি সাহিত্যের লোক নই। তারপরেই তিনি বেছে নিলেন প্রবীণ লেখক শংকরের প্রসঙ্গ। সুগত বললেন, বাংলার লেখকের কাছে শংকর স্বীকৃতি পেয়েছে। বহু দশক ধরে বিদগ্ধ বাঙালি পাঠক তাঁর লেখা পড়ছেন। আজ সাহিত্য অকাদেমিও তাঁকে স্বীকৃতি দিল। গাঁধি বিষয়ক বক্তব্যে তিনি প্রথমেই বেছে নিলেন গাঁধি এবং রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ককে। জাতীয়তাবাদ এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ে দুজনের তৎকালীন অবস্থান ব্যাখ্যা করেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। 

সুগত বলেন, ১৯৪৫ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলা সফরে এসে তিনি গেলেন শান্তিনিকেতনে। রবীন্রনাথ ছিলেন না। গুরুদেবের শান্তিনিকেতন তাঁকে বরণ করে নিয়েছিল। গাঁধিকে অভ্যর্থনা জানানোর সমস্ত ব্যবস্থা রবীন্দ্রনাথ করে গিয়েছিলেন। গাঁধি আপ্লুত হয়ে নিজের শান্তিনিকেতন সফর নিয়ে কয়েকটি লাইন লিখেছিলেন। যে কথাগুলি আজও আমাদের চর্চার বিষয়। ১৯৪৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি বন্ধ হয়ে যাওয়াহরিজনপত্রিকা নতুন করে প্রকাশ করেন গাঁধি। নেতাজী সম্পর্কে নতুন ভাষায়  মূলায়ন করে লিখলেন। গাঁধিজী সব সময় নিজের ভুল স্বীকার করে পালটে নিতেন।‘’ 

অধ্যাপক সুগত বসু বর্তমান ভারতের টালমাটাল আবহের কথা মাথায় রেখে বলেন, ‘’ভারত স্বাধীন হওয়ার পর  নোয়াখালির দাঙ্গার সময় গাঁধি রবীন্দ্রনাথের কবিতার লাইন উল্লেখ করেন, ‘জীবন যখন শুকায়ে যায়, করুণা ধারায় এসো গাঁধি বলেছেন, বিহারে ১৪ শতাংশ মুসলমানকে নিধন করা কি বীরত্বের কাজ? বাংলা যেমন বঙ্কিমচন্দ্র-রবীন্দ্রনাথের জন্ম দিয়েছে, ঠিক তেমনি চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের সন্তানদেরও জন্ম দিয়েছে। আমি হয়ত চরমপন্থার বিরোধিতা করেছিলাম। আমার অহিংসা সংখ্যালঘুদের সেবাতেই নিয়োজিত। গাঁধি বলেছিলেন, ‘সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধানোটা দুই সম্প্রদায়ের নির্বুদ্ধিতা বর্তমান সময়ে বসে আমাদের আজও এই কথা ভাবাচ্ছে।‘’ অধ্যাপক সুগত বসু আমাদের মনে করিয়ে দিলেন, মহাকবি তুলসী দাস বলেছিলেন, যে সাহসী তাঁর সব কিছু ঠিক হয়ে যায়।  

 

Comments

Popular posts from this blog

দু’জন বাঙালি বিঞ্জানীর গণিতিক পদার্থ বিঞ্জানে বিশ্ব বিখ্যাত আবিষ্কার

মধ্যরাতের স্বাধীনতা ও আহত বিবেক

সার্বভৌমত্বের বৃহত্তর গণতন্ত্র আবার সাবেক পথ চেনাবে!