ব্রিগেডে মোদীর সভাঃ এলাহি আয়োজন সত্বেও অর্ধেক মাঠও ভরল না
দীপেন্দু চৌধুরী
২০২১ সালের রাজ্যের বিধানসভা ভোটে বিজেপি নামক দলটি এই রাজ্যে ক্ষমতা দখলের
জন্য মরিয়া প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। সেই জন্যই কি ৭ মার্চের ব্রিগেডের সভায়
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সচেতনভাবে বললেন, ‘অনেক হয়েছে খেলা, এবার খেলা খতম
হবে।’
একটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে দেশের প্রধানমন্ত্রীকে নির্বাচনী প্রচারে
এইভাবে কখনও আসতে কেউ দেখেছেন বলে মনে হয় না। তার সঙ্গে আসছেন বড় ছোট সব কেন্দ্রীয়
মন্ত্রী। বাতাসে টাকা উড়ছে। ব্রিগেড সমাবেশের ছায়া-শীতল ভিভিআইপি মঞ্চ থেকে মোদী
তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্দেশ্যে কটাক্ষ ছুঁড়ে দিলেন, ‘’দিদির
পরিবর্তনের ডাকে বাংলার মানুষ সাড়া দিয়েছিলেন। মানুষ ১০ বছর পরে জানতে চাইছেন, দিদি
হিসেবে আপনাকে বেছে নিয়েছিলেন সকলে। কিন্তু আপনি নিজেকে শুধু ভাইপোর পিসি হিসেবে
সীমাবদ্ধ রাখলেন। কংগ্রেসের ভাই-ভাইপো নিয়ে পরিবারতন্ত্রের পথেই আপনি কেন
হাটলেন?’’
ভোট ঘোষণার পরে ব্রিগেডে প্রথম সভা ছিল বিজেপির শীর্ষ নেতা তথা দেশের
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর। সারা রাজ্যে সাজ সাজ রব ছিল। সূত্রের খবর, ৭
মার্চের ব্রিগেডে লোক আনতে ৬০ লক্ষ টাকা খরচ করে তিনটে ট্রেন ভাড়া করে বিজেপি
রাজ্য কমিটি। বিরোধীদের অভিযোগ, করোনাকালে পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য ট্রেন দেবার সময়
বিজেপি রাজ্য নেতৃত্ব দায়িত্ব নিতে পারেনা। বা রেল মন্ত্রক দায়িত্ব নিতে চায়নি। রাজ্যের মানুষের এ কথা মনে আছে। আর
ব্রিগেডের মাঠ ভরাতে ৬০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে তিনটে স্পেশাল ট্রেন?
ব্রিগেডে সে দিন সকালে পৌঁছে দেখা গেল ঢালাও রান্নার ব্যবস্থা। দূর দূরান্ত
থেকে মানুষ আসছে ব্রিগেডে। ব্রিগেডের ভিড় বাড়াতে কলকাতার বিভিন্ন প্রান্ত সহ
রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রচুর বাস, মিনিবাস, ম্যাটাডোর এনেছিল বিজেপি। রোদ
থেকে নেতাদের বাঁচাতে ছাউনির ব্যবস্থা করেছিল বিজেপি নেতৃত্ব। সেদিনের ব্রিগেডে
তিনটে সুদৃশ্য মঞ্চ করা হয়েছিল মাথার উপরে
ছাউনি সহ। দূর থেকে যেটুকু বোঝা গেল তিনটে মঞ্চেই এয়ার কুলার চলছে। মূল মঞ্চে
ছিলেন প্রধানমন্ত্রী মোদী, সদ্য বিজেপিতে যোগদান করা বলিউড অভিনেতা মিঠুন
চক্রবর্তী (তৃতীয় বার দল বদল), রাজ্য বিজেপির সভাপতি দিলীপ ঘোষ, কৈলাস বিজয়বর্গীয়-সহ
রাজ্য বিজেপির শীর্ষ নেতাদের কয়েকজন। অন্য দুটো মঞ্চে ছিলেন জেলা নেতৃত্ব এবং
সেলিব্রেটি সদস্য-সদস্যারা। ছায়া-শীতল মঞ্চে গরিবের জন্য ভাবেন সেই সব
নেতারা বসেছিলেন।
গুরু তথা মহাগুরু মিঠুনকে নিয়ে গুচ্ছ প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে বিরোধীরা।
প্রধানমন্ত্রীর মঞ্চে দাঁড়িয়ে মিঠুন বলে গেলেন, ‘’আমি জল ঢোঁড়া নই। বেলে বোড়াও নই,
আমি জাত গোখরো, এক ছোবলেই ছবি। এবার কিন্তু এটাই হবে। দাদার কথায় ভরসা রাখবেন।‘’ মহাগুরুর মুখে ভাষা সন্ত্রাস! বিরধীরা প্রশ্ন
তুলছে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে এ সব কথা বলা যায়? বলিউড তারকা জীবনে বাংলার বামফ্রন্টের নেতাদের
সঙ্গে তাঁকে দেখা যেত। সিপিএমের সুভাষ চক্রবর্তীর জন্য প্রচার করতে দেখা গেছে।
মিঠুনের দাবি ছাত্র জীবনে তিনি নকশালপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এটা যদি
রাজনীতির দ্বিতীয় ভাগ হয় তৃতীয় পর্যায়ে লোকসভা ভোটে কংগ্রেসের মঞ্চে প্রণব
মুখোপাধ্যায়ের পাশে দাঁড়িয়ে প্রচার করেছিলেন। কৈফিয়েৎ ছিল তিনি ব্যক্তি প্রণববাবুর
সমর্থনে প্রচারে এসেছেন। পরের পর্বে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগদান এবং রাজ্যসভার সদস্য। সেখানকার
পর্ব গুটিয়ে তিনি এ বার বিজেপির সদস্য। কেন এই সর্পিল যাত্রা তাঁর? ২০১১ সাল থেকে
মিঠুনের রিসর্ট ভেঙে দেবার খাঁড়া ঝুলছে মাথার উপর। নীলগিরিতে এলিফ্যান্ট রিসর্ট
সমেত প্রায় ৩২ টি জমি, রিসর্ট আছে বলিউড খ্যাত ‘ডান্স ডান্সার’-র নায়কের। বন্যপ্রাণী চলাচলের
নিরাপত্তার জন্য ওই সব রিসর্ট ভেঙে ফেলার মামলা চলছে। ব্যবসা, পারিবারিক
জীবনের নিরাপত্তার কারণেই কী বিজেপির ব্রিগেডে হাজির?
মাঠে সামনের ৬০ শতাংশ জায়গা ছেড়ে রাখা হয়েছিল। অজুহাত নিরাপত্তা। ব্রিগেডে
আসা মানুষদের প্রখর রোদে ঘামেভিজতে ভিজতে ঠায় বসে থাকতে হল। তৃণমূল, কংগ্রেস-সিপিএম
সহ বিরোধীরা বলছে, ব্রিগেডে যারা আসছেন তাঁরা রোদে গরমে মাঠে বসে থাকবে আর নেতারা
ছাউনি দেওয়া মঞ্চে আরাম কেদারায় বসে থাকবে? এই সংস্কৃতির সঙ্গে বাংলার মানুষ
পরিচিত নয়।
ব্রিগেডে বিজেপির নির্বাচনী সভা নিয়ে যতই উচ্ছাস বিজেপি নেতৃত্ব করুক নজরে
পড়ারমতো ভিড় খুব কিছু হয়নি। সিপিএমের অভিযোগ, সিপিএমের ব্রিগেডের পুরনো ছবি চুরি
করে বিজেপি ব্রিগেডে মোদীর জনসভা বলে প্রচার করছে। বিজেপির নেতা মুখপাত্ররা
নিজেদের টুইটার অফিসিয়াল হ্যান্ডেল থেকে টুইট করেছেন। রাজীব ব্যানার্জী, গজেন্দ্র
চৌহান, মিঠুন চক্রবর্তী, বিজেপির মুখপাত্র তাজেন্দ্র পাল সিং বাগগা। এরা সকলেই
সিপিএমের ব্রিগেড জনসভার ছবি দিয়ে বিজেপির ব্রিগেড বলে টুইট করেছেন। সিপিএম বলছে
‘ছবি চোর’। সেদিন বেশিরভাগ মানুষকে দেখা গেছে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের আগেই চলে
যাচ্ছেন।
কেউ যাচ্ছেন খাওয়ার ব্যবস্থা যেখানে আছে সেখানে, অথবা কলকাতা ঘুড়তে
যাচ্ছেন। সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে তরুণ প্রজন্মের একজন বিজেপি সমর্থক বলেও ফেললেন। পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথির
যুবক বলল, নেতারা বলেই দিয়েছেন, মনে কর কলকাতা ঘুরতে যাচ্ছ। ভালো খাও, আনন্দ করে
ফিরে এসো। আনন্দ? সকালে ব্রিগেডে এসেই টের পেয়েছিলাম। খোঁজ নিয়ে জানতে
পেরেছিলাম, মাছ, মাংস, সবজি, আনাজ বোঝাই গাড়ি আগের রাতেই এসে পৌঁছেছে। কোনও জেলা
থেকে এসেছে ভোরবেলায়। ব্রিগেডে কর্মী-সমর্থকদের জন্য গ্যাস জ্বালিয়ে রান্নার কাজ
শুরু করে দিয়েছেন রান্নার দায়িত্বপ্রাপ্ত রাধুনিরা। পরিবেশ নামক বিধি নিষেধ শিকেয়
তুলে। দু’টো তিনটে বাসের ছায়ায় পাত পেড়ে চলছে খাওয়া দাওয়া। মাথার উপরে কাক উড়ছে।
যারা খাচ্ছেন তাঁদের একজন বলল, নিরামিষ নয় মাছ, মাংস খাওয়াচ্ছে আমাদের দল বিজেপি।
পরে কলকাতা ঘুরতে যাব। খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছিল মদের আসর। মদের বোতল হাতে অনেকেই
স্লোগান দিচ্ছিল, ‘ভারত মাতা কি জয়’। বিজেপির ব্রিগেড সভাতেও মোদীর আগের দু’টি জনসভা, হলদিয়া এবং হুগলীর
সাহাগঞ্জের মতোই বিশৃঙ্খলা নজরে পড়ল।
দক্ষিণ শহরতলির এক সাংবাদিক বন্ধু ফোন করেছিল। ব্রিগেডে কি রান্না হচ্ছে?
উত্তরে আমি বলেছিলাম, হ্যা হচ্ছে। কেন? সে বলল, ‘বাজারে ‘সুগার ফ্রি’ (চারা পোনা)
মাছ বেশি পাওয়া যাচ্ছে। বড় মাছ, কাটা পোনা ভ্যানিশ। চিকেন ২৫০ টাকা কেজি। এই দামে
মুরগির মাংস খেয়েছি কত বছর আগে? বলতে পারবে? মুরগির দোকানে জিগেস করলাম, এত দাম
কেন? উত্তর পেলাম, সব ব্রিগেডের মাঠে। সন্ধ্যেয় পাড়ায় পাড়ায় পিকনিক।’ দক্ষিণ
শহরতলির বন্ধুর কথা শুনে আমার আক্কেল গুড়ুম। আমি উৎসাহ নিয়ে আরও কয়েকজন বন্ধুকে
ফোন করলাম। কেউ জানাল, গারডেরিচ-খিদিরপুর অঞ্চলে মুরগির মাংস (চলিত কথায় চিকেন)
২৩০ টাকা কিলো। পূর্ব শহরতলি এবং উত্তর কলকাতায় ২৪০টাকা কিলো।
ব্রিগেডের জনসভায় লোক যাই হোক সুচতুর, সুবক্তা মোদী জানেন, ভোটের আগে তাঁর
বক্তব্য রাজ্যবাসী শুনছেন। কারণ বাংলায় প্রতিষ্ঠান বিরোধী একটা হাওয়া বইছে। সেটা
মাথায় রেখেই তিনি আক্রমণে গেলেন তোলাবাজি, সিন্ডিকেট, দুর্নীতির প্রসঙ্গ তুলে।
বললেন, ‘’আমি জানি, এরা বড় খেলোয়াড়। খুব অভিঞ্জ! খুব খেলেছে। খেলে খেলে বাংলার
গরিবদের লুটেছে। কিচ্ছু ছাড়েনি। আমপান-র টাকা লুট করেছে। মানুষের জীবন নিয়ে
খেলেছে। তোলাবাজি, সিন্ডিকেট অনেক কিছু খেলা হয়েছে।‘’ দুর্নীতি নিয়ে মোদী আরও
বলেন, ‘’বাংলায় এত দুর্নীতি হয়েছে যে, ‘করাপশন’ অলিম্পিক (দুর্নীতির অলিম্পিক) করা
যাবে। খেলা শেষ হবে এ বার খেলা খতম! উন্নয়ন শুরু।‘’
‘কালো হাত’ সাদা হল কী ভাবে সংযুক্ত মোর্চার জোটকে কটাক্ষ করে বলেন মোদী।
তার উত্তরে বাম কংগ্রেসের জবাব, রাজ্য
বিজেপির ক্ষমতায় আসার রাস্তা কঠিন হচ্ছে বলে মোদী ‘ভয়’ পেয়েছেন। সেই কারণে
মোদী-দিদি দু’জনেই বাম ও কংগ্রেসকে বারবার আক্রমণ করছেন। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি
অধীর চৌধুরী মনে করিয়ে দিলেন, ‘’এই কথার উত্তর তো আমরা ২০১৬ থেকেই দিয়ে আসছি। যা
করছি প্রকাশ্যে, কোনও গোপনীয়তা নেই। বিজেপি ও তৃণমূল, এই দুই ভূতের হাত থেকে
বাংলাকে উদ্ধার করতে হবে! বাম ও কংগ্রেসের সেই জোটই হল সেই ওঝা, যে এই ভূত তাড়াতে
পারে!’’
সিপিএমের পলিটবুরো সদস্য মহম্মদ সেলিম বলেন, ‘’যে মঞ্চে দাঁড়িয়ে মোদী এ সব
বলছেন, তার পিছন দিকে লাইন দিয়ে যাঁরা রয়েছেন, তাঁরা সব তৃণমূল থেকে আসা। অথচ ডাক
দিচ্ছেন তৃণমূল হঠাও! এই রাজ্যেই ২০১৬ সালে প্রচারে এসে মুকুল রায়, শুভেন্দু
অধিকারীদের দুর্নীতির কথা বলেছেন। এখন তাঁদের হয়েই প্রচার করছেন! বুঝে-শুনে
স্মৃতিভ্রম হয় ওঁদের?’’






Comments
Post a Comment