কৃষি আইন প্রত্যাহার না করলে আমরা ঘরে ফিরব না






দীপেন্দু চৌধুরী

২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর আমরা দেখেছিলাম দিল্লিতে সিএএ-র বিরুদ্ধে অবস্থান করছেন ‘দাদি’-র নেতৃত্বে অসংখ্য মহিলা। ৩১ ডিসেম্বর ২০২০-তে আমরা দেখলাম কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থে প্রণীত তিন কৃষি আইন প্রত্যাহারের দাবিতে কৃষক পরিবারের মহিলারা দিল্লি সীমান্তে অবস্থানে বসে আছেন। তাঁদের স্বামী-সন্তানরা প্রায় ৫০ দিন কেন্দ্রীয় সরকারের আনা কৃষক বিরোধী কৃষি আইন প্রত্যাহারের দাবিতে আন্দোলন করছেন। এই আন্দোলনে এ পর্যন্ত ৫০ জন কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। ৪ জানুয়ারি সরকারের সঙ্গে বৈঠকের শুরুতে আন্দোলনে মৃত সহ-যোদ্ধা (কৃষক)-দের স্মরণে দু’মিনিট নীরবতা পালন করেন ৪০ জন কৃষক নেতা। তবুও অমানবিক সরকারের টনক নড়ছে না।

দিল্লির কনকনে শীত, শৈত্যপ্রবাহ চলছে, তারমধ্যে আবার মূষলধারে বৃষ্টিসে সবকে উপেক্ষা করে আন্দোলনরত কৃষকরা খালি গায়ে বিক্ষোভ দেখাল কয়েকদিন আগে প্রতিবাদে অবিচল থাকলেন আন্দোলনকারীরা। তবুও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের মানবিক ব্যবহারের নিদর্শন পাওয়া যাচ্ছে না। কর্পোরেট সংস্থার স্বার্থে আনা কৃষি আইন প্রণয়নকারী কেন্দ্রীয় সরকার এতটাই নির্দয় এবং নির্মম। সরকারের তানাশাহী চলছেই। কনকনে শীতে অবস্থান তুলতে পুলিশ আবারও জলকামান ব্যবহার করেছে। কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুঁড়েছে। সিংঘু সীমানায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার খবরও পাওয়া যায়। সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে কৃষক নেতা রাজেশ টিকায়েত বলেন, আমরা আন্দোলন করব সরকার জলকামান ব্যবহার করবে না, কাঁদানে গ্যাসের গোলা ছুঁড়বে না এমনটা ভেবে আমরা আন্দোলন করছি না। সরকারের অমানবিক আচরণ কতদূর পর্যন্ত যেতে পারে আমরাও দেখব। আমরা ভগত সিংহের প্রজন্ম, আমরা জালিয়ানাওয়ালাবাগের সন্তান।

৪ জানুয়ারি ছিল মোদী সরকারের মন্ত্রীদের ডাকা সপ্তম রাউন্ডের বৈঠক। এর আগের বৈঠকে কৃষক নেতাদের সঙ্গে যে আলোচনা হয়েছিল, সেই পরিপ্রেক্ষিতে সরকার আশাবাদী ছিল। মন্ত্রীরা কৃষক নেতাদের সঙ্গে দূরত্ব কমানোর ছদ্ম চেষ্টাও করেছিলেন। কৃষকদের তোলা চারটি দাবির মধ্যে দু’টি দাবি মেনেও নেওয়া হয়েছিল এর আগের বৈঠকে মোদীর মন্ত্রীগোষ্ঠী আশা করেছিল কৃষক নেতৃত্ব এদিন কৃষি আইন প্রত্যাহার এবং এমএসপির দাবি বিষয়ে সুর নরম করবে। কৃষক নেতৃত্ব তাঁদের দাবিতে অনড় থেকেই নিজদের অবস্থান পরিষ্কার করে দিয়েছেন। ৪ তারিখের বৈঠেকের শুরুতেই তিন কৃষি আইনে সরকার কী কী সংশোধন আনতে চাইছে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা সে বিষয়ে প্রসঙ্গ তুলতেই গর্জে ওঠেন কৃষক নেতারা। তাঁরা জানিয়ে দিয়েছেন, কৃষি আইনে সংশোধন তাঁরা আগেই খারিজ করেছেন এখন মন্ত্রীরা বলুন সরকার কী ভাবে আইন প্রত্যাহার করবে?

কৃষিমন্ত্রী নরেন্দ্র সিংহ তোমর, খাদ্যমন্ত্রী পীযূষ গয়াল জানতে চান, কৃষি আইন প্রত্যাহার ছাড়া আর কি কোনও বিকল্প নেই? কৃষক নেতৃত্বের কাছ থেকে জবাব পাওয়া গেল, আমাদের প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় বিকল্প তিন কৃষি আইন প্রত্যাহার। আলোচনারত কৃষক নেতাদের উত্তরকে হাজির থাকা অন্যান্য সংগঠনের ৪০ জন কৃষক নেতা টেবিল চাপড়ে সমর্থন জানালেন। কৃষক নেতৃত্বের অভিযোগ, কৃষকদের বিভ্রান্ত করতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর অফিস (MY Gov) থেকে একটি ছবি বিভিন্ন কৃষক নেতাকে ই-মেলে পাঠান হচ্ছে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ক্যাপ্টেন অমরেন্দ্র সিংহ আছেন ও পঞ্জাবের কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিক। ছবির উপরে লেখা ‘মোদী গভর্নমেন্টস স্পেশাল রিলেশনশিপ উইথ শিখস’ (Modi Government’s Special Relationship with Sikhs) কৃষক নেতা যোগীন্দ্র উগ্রহান বলেন, ‘’মন্ত্রী বলছেন, দেশের অনেক কৃষক কৃষি আইন সমর্থন করছেন। তা হলে বৃষ্টির মধ্যে কারা বসে আছেন? আমরা কি বাংলাদেশ, পাকিস্তান থেকে এসেছি?” কৃষিমন্ত্রী ৪ তারিখের বৈঠকে এমএসপি নিয়ে আলোচনা করতে চেয়েছিলেন। কৃষক নেতা দর্শন পাল বলেছেন, ‘’পরের ৮ জানুয়ারির বৈঠক থেকে নতুন কিছু বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা নেই। মান্ডি সুরক্ষিত না হলে এমএসপি-র নিরাপত্তা থাকবে না। আমরা জানিয়ে দিয়েছি কৃষি আইন থাকলে এমএসপি নিয়ে আলোচনা করে কী লাভ?‘’

নতুন কৃষি আইনে আলু, পেঁয়াজ, ভোজ্য তেল, ডাল ইত্যাদী পণ্যসামগ্রীর অঢেল মজুত করার আইনি অধিকার দেওয়া আছে। আইনে আলু, পেঁয়াজ, ভোজ্য তেল, ডাল প্রভৃতি ক্ষেত্রে ৫০-১০০% মূল্যবৃদ্ধির ছাড়পত্র দেওয়া আছে। চাষি এবং কোম্পানীর মধ্যে চুক্তিতে বিবাদ মীমাংসায় পঞ্চায়েত বা রাজ্য সরকারের কোনও ক্ষমতা নেই। সব ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রের হাতে। নতুন কৃষি আইনে কোম্পানীরা আলু, পেঁয়াজ, তেল ডালের এক বছরে দ্বিগুণ দাম বাড়াতে পারবে। চুক্তি চাষির জমি নিয়ে যেখানে ইচ্ছে সেখানে নিজের ইচ্ছেমতো স্থায়ী কাঠামো বানাতে পারবে। চুক্তির পরে চুক্তি-চাষি স্বাধীনভাবে চুক্তি থেকে বেরতে পারবে না। কোম্পানীর সম্মতি লাগবে। কোনও কোম্পানী যে বছর চুক্তি করবে সেই বছরের নির্ধারিত দামেই পাঁচ বছর পর্যন্ত চুক্তিবদ্ধ চাষির সঙ্গে পুনঃনবীকরণ করতে পারবে। কম দামে কৃষিপণ্য কিনে নিয়ে কোম্পানী অথবা প্যানকার্ড আছে এমন কেউ এক রাজ্যে ফসল কিনে অন্য রাজ্যে বেশী দামে বিক্রি করে দিতে পারে। ভাগচাষি চুক্তিতে থাকবে না।

ভাগচাষির ভালো-মন্দ বিচার করবে কোম্পানী ও জমির মালিক। কোম্পানী বা সংস্থা আগে ফসল নেবে, পরে চুক্তি চাষিকে পেমেন্ট দেবে। দুর্যোগ বা কোনও কারণে ফসল খারাপ হলে টাকা আটকে দিতে পারেআন্দোলনকারী কৃষকদের ভয়, নতুন কৃষি আইনে ফসল কেনার জন্য ট্রেড লাইসেন্স লাগবে না। কোনও ট্যাক্স দিতে হবে না। এই কারণে এক মাফিয়ারাজ তৈরি হবে। নতুন কৃষি আইনে চাষির সঙ্গে সংস্থার চুক্তিতে সংস্থার লাভ হবে চাষির ক্ষতি হবে। সম্প্রতি জানা গিয়েছে, দিল্লির শপিং মলে ৫০০ গ্রাম ওজনের ফুলকপির দাম ৩০০টাকা। বিক্রি করছে সরকারি লাইসেন্সপ্রাপ্ত বেসরকারি সংস্থা। কৃষকদের কাছ থেকে কিনেছে অন্য একটি বেসরকারি সংস্থা।

এই সংস্থার প্রতিনিধি কৃষকদের কাছে গিয়ে বলেছে, বাজারে গুলকপির আমদানি খুব ভালো। তুমি কপি না বেঁচলে মাঠেই পড়ে থাকবে। তাই কৃষক যে দামে পাচ্ছে বেঁচে দিচ্ছে। ফুলকপি হাতে নিয়েই উত্তরাখণ্ড থেকে দিল্লি সীমান্তে আসা কৃষকরা সাংবাদিকদের দেখালেন। তাঁরা বললেন, সরকার লাইসেন্স দিচ্ছে এই চুরি করার। কেন্দ্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং কৃষকদের দেড় বছর পরীক্ষামূলকভাবে নতুন কৃষি আইন চালু করে দেখতে বলেছিলেন। কৃষকরা বলেন, আমরা প্রমাণ দিলাম কী হতে যাচ্ছে। নতুন আইন হলে কৃষকের কতটা সর্বনাশ হবে।

সাংবাদিক অজিত অঞ্জুমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কৃষক নেতা রাজেশ টিকায়েত বলেন, ‘’চার ঘণ্টার বৈঠক চার বাক্যে শেষ করে দিল। সংশোধন আমরা মানব না। আইন প্রত্যাহার করতে হবে। আমরা জালিয়ানাওয়ালাবাগের সন্তান আমরা গুলি খেতে জানি। আমাদের মার। মেরে অবস্থান খালি কর। আমরা বুকে গুলি খাব। পীঠে গুলি খাব। ভয় পেয়ে পালিয়ে যাব না।‘’

রাজেশ টিকায়েত জানান, ৪ জানুয়ারি দেড় ঘণ্টার ‘লাঞ্চ ব্রেক’ হয়েছিল। কেন? অন্য দিনে আধ ঘণ্টার হয়। এদিন আমাদের বসিয়ে রেখে সরকারের পেটোয়া কৃষক নেতাদের সঙ্গে মন্ত্রীরা বৈঠক করেন। আমাদের আতঙ্কবাদী বলেছে। ২১ জানুয়ারি থেকে ট্রাক্টর আসতে শুরু করবে। ২৩ তারিখ ট্রাক্টর মিছিলের মহড়া হবে। ২৫ ৬য়ানুয়ারি আমরা দিল্লি যাব। ২৬ জানুয়ারির প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানে আমরা কৃষকরা মার্চ পাস্ট করব। আমরাও ভারতের নাগরিক। সরকার যদি সংঘর্ষ চায় কিষাণও শান্তিপূর্ণভাবে লড়াই করতে জানে। সরকারের কাছে দু’টো রাস্তা খোলা আছে হয় গোলি চালাও নয়ত আইন প্রত্যাহার কর।

৪৫০টি কৃষক সংগঠনের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত সরকারের কাছে একটাই বিকল্প আছে, নতুন কৃষি আইন প্রত্যাহার করা। দ্বিতীয় কোনও বিকল্প খোলা নেই। হয় অর্ডিনান্স এনে আইন প্রত্যাহার করতে হবে না হলে একদিনের জন্য সংসদের অধিবেশন ডেকে আইন প্রত্যাহার করতে হবে। কৃষকদের সাফ কথা কৃষি আইন প্রত্যাহার না করলে আমরা ঘরে ফিরব না।    

 

Comments

Popular posts from this blog

দু’জন বাঙালি বিঞ্জানীর গণিতিক পদার্থ বিঞ্জানে বিশ্ব বিখ্যাত আবিষ্কার

মধ্যরাতের স্বাধীনতা ও আহত বিবেক

সার্বভৌমত্বের বৃহত্তর গণতন্ত্র আবার সাবেক পথ চেনাবে!