‘লাভ জিহাদ’ আইনঃ বৈধতা খতিয়ে দেখবে সুপ্রিম কোর্ট


দীপেন্দু চৌধুরী

একদিকে তথাকথিত ‘লাভ জিহাদ’-কে হাতিয়ার করে বিজেপি শাসিত বিভিন্ন রাজ্যে হিন্দু মহিলা এবং মুসলিম পুরুষের বিয়ে আটকানোর চেষ্টা হচ্ছে। সামাজিক চাপ তথা বল প্রয়োগ ইত্যাদি করেও বিজেপি সহ সংঘপরিবারের কর্মীরা এই বিয়ে আটকাতে পারছে না সাংবিধানিক অধিকারেই দু’ই ধর্মের তরুণ-তরুণী ভিন ধর্মে বিয়ে করতে পারে। তবুও বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলি নতুন আইন এনে ‘ভিন্ন ধর্ম’- র বিয়ে বন্ধ করতে বদ্ধপরিকর। ধর্মান্তরণ বিরোধী আইনকে হাতিয়ার করে উত্তরপ্রদেশের যোগী রাজ্যে সংখ্যালঘুদের নানারকম পন্থায় হেনস্তার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি চলছে সামাজিক বয়কট, ধমকি-হুমকি। যে সব ঘটনার সংবাদ বিভিন্ন সংবাদপত্রের পাতায় উঠে আসছে। সম্প্রতি ২৪ বছরের এক মহিলার ‘জোর করে ধর্মান্তরণ’ করা হয়েছে এই অভিযোগে তিন মুসলিম যুবকের বিরুদ্ধে ‘ভুল করে মামলা করা হয়েছে’ বলে পুলিশ পরে স্বীকার করে নেয়

উত্তরপ্রদেশের বরেলীর বাসিন্দা এক ২৪ বছরের তরুণী গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে আবরার নামে এক মুসলিম যুবকের সঙ্গে চলে যায়। এই ঘটনার পরে ফরিদপুর থানায় একটি অপহরণের অভিযোগ করা হয়। পুলিশ জানতে পারে ওই তরুণী আরবারের সঙ্গে দিল্লির তুঘলকাবাদে পনের দিন একসঙ্গে ছিল। তার পরে মহিলা বাড়ি ফিরে আসেন। সেপ্টেম্বরের পরে নতুন বছরের ১ জানুয়ারি আরবার-সহ তিন জন মুসলিম যুবকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। এই মামলা করা হয়েছিল যোগী সরকারের ধর্মান্তরণ বিরোধী আইনে। পুলিশ জানাচ্ছে গত বছরের ১ ডিসেম্বর যে অভিযোগ করা হয়েছিল, সেই অভিযোগ অনুযায়ী, ওই ২৪ বছরের তরুণী যখন ফরিদপুরে নিজের বাড়িতে ফিরে আসছিলেন, সেদিন আরবার এবং তার দুই তুতো-ভাই মইসুর ও ইরশাদ তাঁকে বিয়ের কথা বলেন। এবং জোর করে ধর্মান্তরণের চেষ্টাও করেন। প্রকৃত ঘটনা এটা ছিল না। পুলিশ তদন্তে নেমে জানতে পারে অভিযুক্ত তিনজন ওই সময় ঘটনাস্থলেই ছিলেন না।

পুলিশের তথ্য প্রমাণ থেকে জানা যাচ্ছে ওই তরুণী এবং তাঁর মামা তিন মুসলিম যুবকের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ এনেছিলেন সে সব মিথ্যে। সংবাদ সংস্থা সূত্রে খবর, বরেলির এসএসপি রোহিত সিংহ সাজওয়ান জানিয়েছেন, আরবার ওই তরুণীকে তাঁর আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে হুমকি দিয়েছিলেন বলে যে অভিযোগ করা হয়েছে, সেই অভিযোগের তদন্ত করা হবে। এই ঘটনা থেকেই বোঝা যাচ্ছে, যোগী সরকারের পুলিশ কতটা বেপরোয়া হতে পারে তাঁদের রাজ্যে।

উত্তরপ্রদেশ সরকারের ‘ প্রহিবিশন অব আনলফুল কনভারশন অব রিলিজিয়ন অর্ডিন্যান্স, ২০২০’ আসার পরে এক মাসে ১৪ টি মামলা হয়েছে। ৪৯ জনের জেল হয়েছে। মাত্র দু’জন মহিলা অভিযোগ জানিয়েছে। 

৩ জানুয়ারি দিল্লিতে ‘ইন্ডিয়া এগেনস্ট লাভ জিহাদ ল’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান বাতিল করে দিয়েছে দিল্লি পুলিশ। ওই দিন দুপুর ১২ টার সময় যন্তর মন্তর-এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে ভিন্ন ধর্মে স্বেচ্ছায় বিয়ে করা  নব-দম্পতিরা নিজেদের অভিঞ্জতার কথা বলতেন। উদ্যোক্তাদের এই রকমের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু দিল্লি পুলিশের আপত্তিতে অনুষ্ঠান বাতিল করতে বাধ্য হলেন তাঁরা। রাজনৈতিক বিশ্লেষক তেহসীন পুনাওয়ালা এই অনুষ্ঠানের প্রধান উদ্যোগক্তা ছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন সমাজবিঞ্জানী আকৃতি ভাটিয়া ও আইনজীবী মনি ছন্দার। পুনাওয়ালা সাংবাদিকদের বলেন, এক জন পুলিশ অফিসার আমাদের বলেন, তাঁদের কাছে নির্দেশ আছে, ওই দম্পতিদের (‘such couples’) নিয়ে এই অনুষ্ঠান করতে দেওয়া যাবে না। আমি জানতে চেয়েছিলাম such couples’  মানে কি? আমরা সবাই একসঙ্গে ‘ভালোবাসা’ উদযাপন করতে চাইছি গানের সঙ্গে। কিন্তু দিল্লি পুলিশ আইনের দোহাই দিয়ে এই অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিল। আমরা ১০ জানুয়ারি এই অনুষ্ঠান আবার করব।‘’ দিল্লি পুলিশের যুক্তি ছিল কোভিড-১৯ ও শব্দ দূষণের জন্য এই অনুষ্ঠান করা যাবে না।

টিম পুনাওয়ালা, টিম ভাটিয়া ও টিম ছন্দার একটি প্রেস বিঞ্জপ্তির মাধ্যমে ১০ জানুয়ারি সবাইকে অনুষ্ঠানে আসতে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। বিবৃতিতে জানান হয়েছে, ভালোবাসা ধর্ম মেনে হয় না। ভালোবাস কোনও জাত বা লিঙ্গের উপর নির্ভর করে হয় না। ভালোবাসা স্বাভাবিক ভাবেই গড়ে ওঠে। পাশাপাশি তাঁরা জানাচ্ছেন, ভারতের প্রাপ্তবয়স্ক মহিলাদের স্বাক্ষরিত একটি চিঠি জাতীয় মহিলা কমিশনের কাছে পাঠান হয়েছে। এই চিঠিতে উত্তরপ্রদেশ ও অন্যান্য রাজ্য সরকারের ধর্মান্তরণ বিরোধী প্রস্তাবিত বিলের উদ্দ্যেশ্য নিয়ে আপত্তি জানিয়ে এই পিটিশনে স্বাক্ষর করেছেন, অভিনেত্রী কঙ্কনা সেনশর্মা, সায়েমা রহমান, ফিল্মমেকার শিল্পী গুলাটি, সাংবাদিক প্রিয়া রমানী, পামেলা প্রেরিয়া, বিদ্যা কৃষ্ণান, স্বাগতা ইয়াদোয়ার, সমাজকর্মী ডঃ ফ্লভিয়া অ্যাগনেস ও অ্যানি রাজা সহ আরও অনেকে।

উত্তরাখণ্ড ও উত্তরপ্রেদেশের ধর্মান্তরণ বিরোধী আইন নিয়ে কিছুদিন হল চর্চা হচ্ছে। বিতর্কও শুরু হয়েছে। উত্তরপ্রদেশ সরকারের ‘প্রহিবিশন অব আনলফুল কনভারশন অব রিলিজিয়ন অর্ডিন্যান্স, ২০২০’ এবং উত্তরাখণ্ডের ‘উত্তরাখণ্ড ফ্রিডম অব রিলিজিয়ন অ্যাক্ট, ২০১৮ আনা হয়েছে ভিন ধর্মের বিয়ে আটকাতে। হিমাচল প্রদেশ ও মধ্যপ্রদেশও একই আইন পাশ করেছে। ধর্মান্তরণ বিরোধী আইনগুলিকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে একাধিক আবেদন করা হয়েছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, সমাজকর্মী তিস্তা শেতলওয়াড়ের স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘সিটিজনস ফর জাস্টিস অ্যান্ড পিস’ ও আইনজীবী বিশাল ঠাকরের আনা আর্জি। এসব মামলার শুনানিতে প্রধান বিচারপতি শরদ অরবিন্দ বোবডের বেঞ্চ আইনগুলির বৈধতা খতিয়ে দেখতে রাজি হয়েছে। এই বিষয়ে ৬ জানুয়ারি শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ কেন্দ্রীয় সরকার, উত্তরাখণ্ড ও উত্তরপ্রদেশের সরকারকে নোটিস পাঠিয়েছে।   

                                (লেখাটি ৮ জানুয়ারি ‘সপ্তাহ’ পত্রিকায় প্রকাশিত)   

 

Comments

Popular posts from this blog

দু’জন বাঙালি বিঞ্জানীর গণিতিক পদার্থ বিঞ্জানে বিশ্ব বিখ্যাত আবিষ্কার

মধ্যরাতের স্বাধীনতা ও আহত বিবেক

সার্বভৌমত্বের বৃহত্তর গণতন্ত্র আবার সাবেক পথ চেনাবে!