ফেক নিউজের জালে বিজেপির আইটি সেল






দীপেন্দু চৌধুরী

সামাজিক মাধ্যমে ‘ফেক নিউজ’ নিয়ে অসন্তোষ ক্ষোভ জানাচ্ছেন অনেকেই গত কয়েক বছর ধরে বিশেষত ভারতে।  এই বিষয়ে সাংবাদিক, বিভিন্ন ব্যক্তি, রাজনৈতিক সংগঠন, রাজনৈতিক নেতা, খেলোয়াড়, চলচ্চিত্র অভিনেতা, অভিনেত্রী, লেখক, সেলিব্রেটি এবং ধর্মীয় সংগঠনের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। মূল অভিযোগ বিজেপির আইটি সেলকে কেন্দ্র করে। দিল্লিতে কেন্দ্রের তিনটে কৃষি আইন প্রত্যাহারের দাবিতে কৃষক আন্দোলন নিয়ে ‘ফেক নিউজ’ ছাকনিতে ধরে ফেলল ‘টুইটার ইন্ডিয়া’। সম্প্রতি সংবাদে প্রকাশ, বিজেপির আইটি সেলের প্রধান অমিত মালবীয়রের করা একটি টুইটকে ‘ভুয়ো’ বলে চিহ্নিত করেছে টুইটার কতৃপক্ষ।

কৃষক আন্দোলনের একটি ফুটেজ টুইট করেছিলেন বিজেপির আইটি সেলের অন্যতম ব্যক্তিত্ব অমিত। সেই টুইটকে ‘ম্যানিপুলেটেড মিডিয়া’ বলে চিহ্নিত করেছে ভারতীয় টুইটার কতৃপক্ষঅমিত এডিট করা যে ভিডিও পোস্টটি করেছিলেন, সেটি যে ‘ভুয়ো’ নেট ব্যবহারকারীদের জানিয়ে দিল অত্যন্ত জনপ্রিয় টুইটার নামক সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সংস্থা। নেটিজন এবং সোশ্যাল মিডয়া বিশেষঞ্জরা মনে করছেন অমিত মালবীয় হলেন প্রথম রাজনীতিক যাঁর টুইটের ফ্যাক্ট চেক করল বিশ্বের প্রথমসারির সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সংস্থা টুইটার।

সম্প্রতি কংগ্রেস নেতা রাহুল গাঁধী দিল্লিতে অবস্থানরত কৃষকদের উপর পুলিশের লাঠিচার্জের একটি ছবি টুইট করেছিলেন। সেই ছবিতে দেখা গেছে শীর্ণকায় আন্দোলনকারী এক কৃষককে লাঠি মারতে যাচ্ছে দিল্লির এক পুলিশ কর্মী। পঞ্জাবের কৃষকের নাম সুখদেব সিংহ। গত ২৮ নভেম্বর ওই একই ছবি ব্যবহার করে ১৪ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ক্লিপ টুইট করেন অমিত মালবীয়। সেই ভিডিয়োতে দেখা গিয়েছে, দিল্লি পুলিশের পুলিশকর্মী বৃদ্ধ কৃষককে মারছেন না। ভিডিও ক্যাপশনে লেখা ছিল ‘পুলিশকর্মী কৃষককে স্পর্শও করেননি’। এই টুইট নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয়। কয়েকটি ফ্যাক্ট চেকিং সাইট পুরো ভিডিওটি প্রকাশ করে। সেই ভিডিও দেখে বোঝা যায়, বিজেপির সোশ্যাল মিডিয়া বিশেষঞ্জ অমিত মালবীয় ‘ম্যানুপুলেট’ করে লাঠিপেটার অংশটি নিজের করা টুইট থেকে বাদ দিয়েছেন।

পরে ভারতের সাহসী এবং নিরপেক্ষ সংবাদ মাধ্যমের সাংবাদিকরা খুঁজে বার করেন ষাট বছর বয়সি আহত সুখদেব সিংহকে। তিনি হেঁটে দিল্লি এসেছেন পঞ্জাবের কপূরথলা থেকে। পুলিশ যখন লাঠিচার্জ করে সুখদেব সামনে পড়ে যায়। সুখদেব নিজেও লাঠির ঘায়ে আহত হন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে সুখদেব নিজের জামার হাতা তুলে দেখান। পুলিশের লাঠির দাগ। কালো হয়ে রক্ত জমে গেছে সেই হাতে। পায়েও কালসিটে। সংবাদ মাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘’কেন যে পুলিশ এ ভাবে মারল বুঝলাম না। হাতে পায়ে পিঠে মেরেছে। আমরা ইট-পাটকেল কিছু ছুঁড়িনি বা স্লোগান দিইনি।        

সম্প্রতি কলকাতা থেকে করা একটি ভুয়ো টুইট নিয়ে পুলিশে অভিযোগ জমা পড়েছে। দিল্লিতে কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে খালিস্তানিদের যোগাযোগ আছে এই প্রচার বিজেপি থেকে আগেই করা হয়েছিল। সেই সূত্র ধরে কংগ্রেস সভানেত্রী সনিয়া গাঁধির নাম জড়িয়ে টুইট করে বিজেপির আইটি সেলের ঋষি বাগরি নামে একজন। তার টুইট থেকে তুলে দিচ্ছি। ’Khalistani terrorists Assassinated PM Indira Gandhi Same Khalistani Terrorist now wants to Assassinate PM Modi In both case the beneficiary was the same-Sonia Gandhi’’ বাংলা তর্জমা করলে ঋষির মন্তব্যের মানে দাঁড়ায়, খালিস্তানি সন্ত্রাসবাদীরা প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গাঁধীকে হত্যা করায় লাভবান হয়েছিলেন সনিয়া গাঁধী। এখন তারা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর একই রকম ক্ষতি করতে পারলেও লাভবান হবেন সনিয়া নিজে। ঋষির করা টুইটের এই মন্তব্য নিয়ে ১ ডিসেম্বর কলকাতার শেক্সপীয়র সরণী থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন প্রদেশ কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক রোহণ মিত্র। পরে ঋষির করা টুইটের প্রতিবাদে কংগ্রেস থেকে বিক্ষোভও দেখান হয়।  

 খুব সম্ভবত কয়েক মাস আগে সিপিএমের সাধারণ সীতারাম ইয়েচুরির নামে করা একটি টুইট নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। সীতারাম ইয়েচুরি টুইটার আইডি খোলেন ২০১৫ সালের ২৭অক্টোবর। বিজেপির আইটি সেল ২০১৫ সালের ২০ অক্টোবরের স্ক্রিনশট দিয়ে বিজেপি ‘ভুয়ো টুইট’ দেখায়। সিপিএম থেকে অভিযোগও করা হয়েছিল। ইয়েচুরির টুইটার হ্যান্ডেল আইডি খোলার সাতদিন আগে স্ক্রিনশট বিজেপি পেল কোথায়? সিপিএম থেকে এই অভিযোগ করা হয়েছিল।

ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমের একটা অংশ কৃষকদের প্রতিবাদ আন্দোলনকে কোনও প্রমাণ ছাড়াই ‘খালিস্তানি’ বা ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ তকমা দেগে দিতে চাইছে। দেশের এডিটর্স গিল্ড বিষয়টা নিয়ে গভীর উদ্বেগে রয়েছে। একটি ‘মিডিয়া অ্যাডভাইজারি’ প্রকাশ করে এডিটর্স গিল্ড অব ইন্ডিয়া বলেছে, ‘’এটি ন্যায়সঙ্গত ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার ধারণার পরিপন্থী। এমন কাজ সংবাদ মাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতার ক্ষতি করে।‘’ 

মাত্র একটি দু’টি ঘটনা থেকে নয় একাধিক এমন ‘ফেক নিউজ’ সামাজিক মাধ্যমে করা হয়। বিভিন্ন উপায়ে এক এক জনকে টার্গেট করে তার মানহানি করার চেষ্টা করা হয়ে থাকেধর্মীয় প্ররোচনা মূলক ছবি, ভিডিও প্রভৃতি বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করার বিভিন্ন খবর আমাদের নজরে আসে। সতর্ক না থাকলে সেই সব ছবি শেয়ার করলে গোষ্ঠী সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে যেতে পারে। যৌন আবেদনমূলক নিম্ন মানের ছবির ছড়াছড়ি সোশ্যাল মিডিয়ায়। যে গুলি ‘ব্লু ফিল্ম’ বলা হয়ে থাকে। কম বয়সি ছেলেমেয়েরা ‘ভুয়ো’ যৌন হেনস্থার কারণে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হছে অনেক সময় নিজেদের আত্মসম্মান রক্ষা করতে। এ সব ক্ষেত্রে পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে দেখা গেছে। সোশ্যাল মিডিয়া নামক জনপ্রিয় মাধ্যম সামাজিক পারিবারিক জীবনে অবক্ষয় ডেকে আনছে কি? এখনই সতর্ক হতে হবে। যে বার্তা টুইটার কতৃপক্ষ আমাদের দিয়েছেন।  

                          (এই লেখাটি ৪ ডিসেম্বর ‘সপ্তাহ’ পত্রিকায় প্রকাশিত)               

 

Comments

Popular posts from this blog

দু’জন বাঙালি বিঞ্জানীর গণিতিক পদার্থ বিঞ্জানে বিশ্ব বিখ্যাত আবিষ্কার

মধ্যরাতের স্বাধীনতা ও আহত বিবেক

সার্বভৌমত্বের বৃহত্তর গণতন্ত্র আবার সাবেক পথ চেনাবে!