কৃষক অভ্যুত্থানঃ খোলা আকাশের নীচে ‘অন্নদাতারা’
দীপেন্দু চৌধুরী
কয়েক দফা বৈঠকের পরও কৃষি আইন প্রত্যাহারের দাবি থেকে কৃষক আন্দোলনের
নেতৃত্বকে সরাতে ব্যর্থ হলেন মোদী সরকারের মন্ত্রীরা। হরিয়ানা-দিল্লি সীমানায়
ট্রাক্টর নিয়ে কৃষকরা জাতীয় সড়ক অবরোধ করে বসে থাকায় কেন্দ্রীয় সরকারের উপর চাপ
বেড়েই চলেছে। আন্দোলনের চাপে ডিসেম্বরের প্রথমদিন কৃষিমন্ত্রী নরেন্দ্র সিংহ তোমর বিভিন্ন
কৃষক সংগঠনের ৩৫ জন নেতাকে নিয়ে বৈঠকে বসেছিলেন। সরকারের উদ্যোগে দ্বিতীয় এই বৈঠক
ছিল সমাধানের রাস্তা খুঁজতে।
সরকারের তরফে প্রস্তাব ছিল, সরকারের বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধি এবং কৃষক
সংগঠনের নেতাদের নিয়ে একটি কমিটি তৈরি করে আলোচনা শুরু করার। শর্ত দেওয়া
হয়েছিল, অবস্থান আন্দোলন প্রত্যাহার করতে হবে। সারা দেশের বিভিন্ন কৃষক সংগগঠনের
৩৫ জন নেতা মাথা না নুঁইয়ে আন্দোলনে অনড় থাকার সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে
জানিয়ে দেয়। তারা একসুরে দাবি জানায়, কৃষি আইন প্রত্যাহার না করলে দিল্লির সীমানা
অবরোধ করে আন্দোলন চালিয়ে যাবেন তারা। ৫ ডিসেম্বরের বৈঠকেও কৃষক সংগঠনের নেতৃত্ব
‘মৌনব্রত’ অবলম্বন করে থাকলেন। হাতে করে প্ল্যাকার্ড নিয়ে গিয়েছিলেন। প্ল্যাকার্ডে
লেখা ছিল ‘ইয়েস অর নো’? ‘নো চর্চা’, অর্থাৎ সরকার কৃষি আইন প্রত্যাহার করবে? হ্যা
কি না? তারপরে আলোচনা।
দিল্লি-হরিয়ানা সীমানায় ৯৬ হাজার ট্রাক্টর নিয়ে কনকনে ঠান্ডায় কয়েক লক্ষ
কৃষক অবস্থান বিক্ষোভ করছে গত কয়েকদিন ধরে। তারা প্রস্তুত হয়েই এসেছে। ৪০ দিনের
রসদ নিয়ে দিল্লির রাজপথে খোলা আকাশের নীচে দিন-রাত আন্দোলনের রাশ ধরে রেখেছে।
ভারতের কৃষক আন্দোলনে এ যেন এক নতুন অধ্যায়। কেন্দ্রের পুলিশ টিয়ার গ্যাসের শেল
ফাটিয়ে, নির্মম লাঠিচার্জ করে তাদের হঠিয়ে দিতে চেয়েছে। কৃশকায় প্রৌঢ় কৃষক লাঠির
মার সহ্য করেও রাস্তা ছেড়ে যায়নি। দিল্লির কনকনে শীতে পুলিশ জলকামান দিয়ে মিছিলের
আত্মপ্রত্যয় ভাঙতে চেয়েছে। ট্রাক্টর মিছিল আটকাতে পুলিশ সিমেন্টের বড় বড় বোল্ডার
রাস্তায় নামিয়ে দিয়েছে। লোহার ব্যারিকেড দিয়েও ট্রাক্টর মিছিল আটকাতে পারেনি অমিত
শাহের পুলিশ। তাই সিমেন্টের বোলডার নামাতে বাধ্য হয়েছে।
যে ছবি আমরা এনডিটিভি (হিন্দি-ইংরেজি) সহ কয়েকটি অনামী টিভির পর্দায়
দেখেছি। যদিও ‘গোদী মিডিয়া’ এই খবর নিজেদের নিউজ চ্যনেলে দেখায় নি। আন্দোলনকারী
কৃষক অনড় মানসিকতা নিয়েই এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছে। আইন বাতিল না করলে তারা
আন্দোলন থেকে সরবে না। বিষয়টা আর উপেক্ষা করার নয়। নিজেদের রুটি-রুজির প্রশ্ন। গত
কয়েক বছর ভারতীয় কৃষক নিজেদের দাবির সমর্থনে রাস্তায়, রেল লাইনের উপর দিনের পর দিন
অপেক্ষা করেছে। তাদের মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে মোদী সরকার বহুজাতিক সংস্থার
স্বার্থে নতুন কৃষি আইন লাগু করেছে।
কৃষিমান্ডি এবং কৃষকদের নিয়ে কেন্দ্রের অযৌক্তিক অবস্থান গত কয়েক বছরের
ঘটনা। তারপরে এসেছে তিনটে বিতর্কিত কৃষি আইন। প্রথম আইন ‘The Essential Commodity’s (Amendment) Bill 2020’ । এই বিলের অধিকারবলে ২০টির বেশি নিত্যপ্রয়োজনীয়
দ্রব্যসামগ্রী অত্যবশ্যকীয় পণ্য তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই তালিকার
প্রধান দ্রব্যসামগ্রী হচ্ছে, চাল, ডাল, আটা, আলু, চিনি, পিঁয়াজ এবং ভোজ্য তেল। ১৯৫৫
সালে এই আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল দুর্যোগের সময় বা অভাবের সময় সরকার কৃষকদের কাছ
থেকে খাদ্যশস্য কিনে নেবে। এবং সরকারি গণবন্টন ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের সাধারণ
কৃষকদের কাছ থেকে খাদ্য শস্য কিনে নেবে।
নতুন আইনের ক্ষমতার বলে কৃষকদের থেকে কৃষিপণ্য কিনতে সরকার বাধ্য নয়। ৫ জুন কেন্দ্র প্রথম অধ্যাদেশ আনে। করোনা কালে
সেই সময় সংসদ বন্ধ ছিল, সেই সুযোগে সরকার এই অধ্যাদেশ আনে। পরে আইন পাস হয়। ২০
জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ভারতীয় কৃষক টানা অবস্থান বিক্ষোভ করে যাচ্ছে। পঞ্জাব
হরিয়ানায় ট্রাক্টর নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন হয়। দু’টি রাজ্যের ট্রাক্টর মিছিলে রাহুল
গাঁধি নিজে হাজির হয়ে কৃষকদের আন্দোলনকে কংগ্রেসের তরফে সমর্থনের কথা জানান।
পঞ্জাবের মিছিলে রাহুল গাঁধির সঙ্গে সেই রাজ্যের কংগ্রেসী মুখ্যমন্ত্রী ক্যাপ্টেন
অমরেন্দ্র সিংহ ছিলেন। ৪৮ দিন ধরে টানা রেললাইন অবরোধ করে রাখে আন্দোলনকারী
কৃষকেরা। সেই সময়েও কেন্দ্রের তরফে বৈঠক করে আন্দোলন প্রত্যাহারের আবেদন জানান হয়।। কৃষক নেতৃত্ব সেই বৈঠকে
হাজির থেকে কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছিল। সেদিনের আলোচনার জন্য
সরকার যে কমিটি তৈরি করেছিল তার বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছিল কৃষক নেতৃত্ব।
ভারতীয় কিসান সংঘের অধ্যক্ষ গুরুনাম সিংহ চড়নী বলেছেন, ‘’সরকারের গড়ে দেওয়া
ওই কমিটিকে আমরা অনুমোদন দিতে পারিনি। কারণ ওই কমিটিকে আলোচনার জন্য অনুমোদন দেওয়া
যায় না। হরিয়ানার মাত্র তিনজন সাংসদ ছিল ওই কমিটিতে। বিষয়টার সঙ্গে সারা ভারতের
কৃষকদের স্বার্থ জড়িয়ে আছে। তাই আমরা যাইনি। কিন্তু কৃষিমন্ত্রীর ডাকা বৈঠকে আমরা
গিয়েছিলাম। কৃষিমন্ত্রী নরেন্দ্র সিংহ তোমর আমাদের জানায় কৃষি আইন বাতিল করা যাবে
না। একথা শোনার পর আলোচনায় আমরা আগ্রহ হারিয়ে বৈঠক থেকে বেরিয়ে আসি। বিজেপি
ষড়যন্ত্র করে আলোচনা ভেঙে দিতে চাইছে। কিন্তু সেটা পারবে না।‘’
গুরুনাম আরও জানান, ১ ডিসেম্বরের
আলোচনায় একই অভিঞ্জতা হয় আমাদের। মাত্র কয়েকজনকে ডেকে বৈঠক করতে চেয়েছিল। আমরা সাফ
বলে দিয়েছিলাম, ভারতে ৫০০-র বেশি কৃষক সংগঠন আছে। সব স্তরের কৃষক সংগঠনের
প্রতিনিধিদের ডাকতে হবে। তারপরে এক তারিখের বৈঠকে অন্যদের ডাকা হয়। বিজেপির কৌশলে
ভারতীয় কিসান আর বিশ্বাস করতে রাজি নয়।
দেশের ‘অন্নদাতা’ বলছে, মোদীর শাসন আর বেশি দিন নয়
কেন্দ্র বলছে, কিসান আন্দোলন পঞ্জাবের কৃষকদের। তথ্য কিন্তু অন্য কথা বলছে।
কর্ণাটক, ওড়িশা, তামিলনাড়ু সহ দেশের বিভিন্ন রাজ্য থেকে কিসান মিছিল রাস্তায় আটকে
আছে। দূরত্বের কারণে তারা দিল্লি আসতে পারছে না। রাজ্য সরকারের পুলিশ সেই সব মিছিল দিল্লির পথে
আসতে বাঁধা দিচ্ছে। বিভিন্ন উপায়ে ছোট জাঠা আটকে দিয়েছে উল্লেখিত রাজ্যের প্রশাসন।
আমাদের মনে আছে ২০১৭ সালে এপ্রিল মাসে তামিলনাড়ুর কিসানদের আন্দোলন। দিল্লিতে তারা
টানা ৪০-৬০ দিন অবস্থান বিক্ষোভ করেছিল। ইঁদুর খেয়ে, মড়া মানুষের মাথার খুলি
প্রভৃতি নিয়ে অভিনব এক আদিমতায় তারা নাগরিক সভ্যতার কাছে তাদের বক্তব্য তুলে ধরতে
চায়। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা থেকে তারা এধরণের আন্দোলন করতে বাধ্য হয়েছে। ‘গোদী মিডিয়া’
সেই আন্দোলনের কোনও খবর ভারতের সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ করেনি। কৃষকরা আন্দোলনের
বার্তা দেশের কৃষিজীবী বন্ধুদের কাছে পোছে দিতে অভিনব কৌশলে আন্দোলন করে। নিজেদের
গায়ের পোশাক খুলে ‘উলঙ্গ’ হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। জমিতে খাবার খেয়ে প্রতিবাদের
ভাষা চেনাতে চায় কেন্দ্রীয় সরকারকে।
কি অদ্ভূত সমাপতন। নতুন কৃষি আইন এনে ভারতীয় কৃষককে একপ্রকার বেকার করে
দিতে চাইছে সরকার। কিন্তু চলতি বছরে যখন আর্থিক মন্দা ঘোষণা করা হচ্ছে তখন আমরা
দেখতে পাচ্ছি কৃষিক্ষেত্রে বৃদ্ধি সব থেকে বেশি। ২৭ নভেম্বর জাতীয় পরিসংখ্যান দফতর
জানিয়েছে, জুলাই-সেপ্টেম্বরে দেশের জিডিপির ৭.৫% সঙ্কোচন হয়েছে। এপ্রিল-জুনে
জিডিপির ২৩.৯% সঙ্কোচন হয়েছিল। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পরপর দু’টি ত্রৈমাসিকে
জিডিপির সঙ্কোচন মানে দেশে আর্থিক মন্দা চলছে। ভালো খবর বলতে কৃষি ক্ষেত্রে ৩.৪%
বৃদ্ধি। তার মানে দাঁড়ায় ভারতের কিসান কাজ করে উৎপাদন করেছে। তবু আমাদের বলতে
হচ্ছে কিসানের কোনও গণতান্ত্রিক দেশ নেই!
২০১৮ সালের মার্চ মাসে দুনিয়াকাঁপানো ছয় দিনের ‘কিসান লং মার্চ’ হয়েছে। ৪০
ডিগ্রি গরমে নাসিক থেকে মুম্বাই ১৮০ কিলোমিটার হেঁটেছিল কৃষকরা। হেঁটে আসা কৃষকদের
হাঁ-মুখ পায়ের ছবি দেখে চমকে উঠেছিল সারা দেশের মানুষ। চলতি বছরের ২৬ নভেম্বর ছিল
সারা দেশে ধর্মঘটের দিন। বিরোধী দলের ট্রেডইউনিয়ন নেতৃত্ব নতুন কৃষি আইন এবং
শ্রমিকবিরোধী শ্রম আইন বাতিলের দাবি জানিয়েছে। তাদের দাবি, সারা দেশে
২৫ কোটি মানুষ ধর্মঘটে সামিল হয়েছিলেন। সূত্রের খবর, ২০ লক্ষ অবসরপ্রাপ্ত সেনানী
মহাবিদ্রোহে অংশগ্রহণ করতে পারে। প্রথম দফায় দুই হাজার ঘোড়া নিয়ে কয়েক হাজার
অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকের দিল্লির বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার কথা আছে। মহারাষ্ট্র থেকে ৩ লক্ষ
কৃষক আন্দোলনে যোগ দেবেন।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, দিল্লির স্টেডিয়ামগুলিকে অস্থায়ী জেল বানাতে চেয়েছিল
অমিত শাহের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক। বর্ষীয়ান সাংবাদিক পি সাঁইনাথ একটি সাক্ষাৎকারে
বর্খা দত্তকে বলেছেন, ‘সরকার বলতে পারে আমরা তিনটে আইন স্থগিত রাখছি। এবং আলোচনা
শুরু করতে চাইছি। শান্তা কুমার প্যানেল বলেছিল, ৫.৪ শতাংশ কৃষক ন্যুনতম সহায়ক
মূল্যে তাদের কৃষিপণ্য বিক্রি করে। তাহলে সরকার লিখিতভাবে কেন জানাচ্ছে না যে,
এমএসপি থাকবে। ২০১১ সালে মোদী নিজে ‘কনজিউমার অ্যাফেয়ার্স গ্রুপের’ চেয়ারম্যান
হিসেবে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহকে চিঠি দিয়েছিলেন। সেই চিঠিতে ন্যুনতম সহায়ক মূল্যের
(এমএসপি) অবনমন ঘটিয়ে সরকার কৃষি ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না একথা লেখা ছিল।‘’ সাঁইনাথ প্রশ্ন
তুলেছেন, মোদী নিজে প্রধানমন্ত্রী হয়ে এখন এই আইন লাগু করছেন কি করে?’
স্বরাজ ইন্ডিয়ার সম্পাদক যোগেন্দ্র যাদব বলেছেন, ‘তীব্র ঠান্ডায় জল কামান
ব্যহার করে লাঠি চার্জ করে আন্দোলন ভাঙতে চাইছে সরকার। এ কোন দেশে আমরা বাস করছি?
যে দেশে সংবিধানদিবস পালন করা হচ্ছে সেই দেশেই মানুষের প্রতিবাদ করার অধিকার নেই?’
দেশের কৃষক নেতৃত্বের দাবি ১৯৭৭ সালের কৃষি আইনে বলা হয়েছে, দেশে একটাই
সবজিমাণ্ডি থাকবে। যে কোনও রাজ্যের কৃষক নিজের জমির উৎপাদিত ফসল অন্য রাজ্যের
সবজিমান্ডিতে বিক্রি করতে পারবে। তাহলে নতুন করে ‘এক দেশ এক মান্ডি’ করার কি
প্রয়োজন? আইন বাতিল না করলে আমাদের আমরণ আন্দোলন চলবে। মরেঙ্গে নেহি তো আইন বাতিল
করেঙ্গে।






Comments
Post a Comment