স্যার আমার স্কুল সার্টিফিকেট হারিয়ে গেছে




দীপেন্দু চৌধুরী
সম্প্রতি রাষ্ট্রসংঘের মহাসচিব আন্তেনিও গুতারেস দাবি করেছেন, জলবায়ু তথা উষ্ণায়ন বিষয়ে বিশ্ব নেতৃত্বকে বাস্তববাদী পরিকল্পনা নিতে হবে। দূষণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে ২০৫০ সালের মধ্যে গ্রীণ হাউসগ্যাস নির্গমন নেট জিরোতে আনার আনুষ্ঠানিক দাবি জানিয়েছেন রাষ্ট্রসংঘের মহাসচিব। চলতি বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্ক শহরে অনুষ্ঠিত ‘ইউ এন ক্লাইমেট অ্যাকশন সামিট’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার আহ্বান করেছেন রাষ্ট্রসংঘের মহাসচিব আন্তেনিও গুতারেস। তার আগে আমাদের নতুন করে অভিঞ্জতা হল সুন্দরবনের অন্যতম আলোচ্য দ্বীপ ‘সাগর’ ঘুরে আসার। নদীভাঙ্গন, পরিবেশ, স্থানীয় মানুষের ভিটেমাটি হারানো এক নতুন উপখ্যান শুনে এলাম কিছুদিন আগে।  
বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ সমৃদ্ধ অঞ্চল হচ্ছে সুন্দরবন।  এই বনাঞ্চলের আনুমানিক ২৬০০০ বর্গ কিলোমটার আছে বাংলাদেশে। অর্থাৎ দুই তৃতীয়াংশ সুন্দরবন আছে বাংলাদেশে। আনুমানিক ১০০০০ বর্গ কিলোমটার বনাঞ্চল আছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। অর্থাৎ এক তৃতীয়াংশ আছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। সুন্দরবনের ৪০% আছে আমাদের এই বাংলায়। সুন্দরবন ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ তালিকাভুক্ত বনাঞ্চল। বন্যপ্রাণ সমৃদ্ধ সুন্দরবনকে ‘রামসর’ অঞ্চল হিসেবেও ঘোষণা করা হয়েছে। ভারত এবং বাংলাদেশে, যৌথভাবে ধরলে আনুমানিক ১৩ মিলিয়ন মানুষ বসবাস করে এতদ অঞ্চলেপশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগণায় মোট ৩০টা ব্লক আছে। এর মধ্যে ১৯টা ব্লককে রাজ্য সরকারের সুন্দরবন উন্নয়ন দফতর কমিউনিটি উন্নয়ন ব্লক (সিডিব্লক) হিসেবে ঘোষণা করেছে।  
সুন্দরবনের জনসংখ্যা ৮.৫ মিলিয়ন। পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবনের অংশের ৪১% আছে উত্তর ২৪ পরগণা জেলায়। ৩১% আছে দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলায়। দারিদ্রের হার ৪৩.২৩ শতাংশএই হিসেবে ভারতের গড় দারিদ্রের সঙ্গে তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। ভারতের গড় দারিদ্র ২১.৯২ শতাংশ। দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার ঘোড়ামারা, লোহাচরা, বিশালক্ষ্মী মৌজার ৫৬০ একর চাষযোগ্য জমি নদীগ্রাসে চলে গেছে গত কয়েক বছরেসরকারি তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে, সাগর ব্লকের ১৪টা গ্রামের জমি নদীগ্রাসে ভেসে গেছে। বিশালক্ষ্মী গ্রাম অনেক আগেই জলের তলে ভেসে গেছে। পরে লোহাচরা নামের জনপদও হারিয়ে গেছে। টিকে ছিল ঘোড়ামারা গ্রাম। সাগর-ঘোড়ামারা এবং মৌসুমী তিনটে অঞ্চল পাঁচ দশক আগে কলকাতার থেকে বড় এলাকা ছিল বলে দাবি করছেন সরকারি আধিকারিকরা। জম্বুদ্বীপ নামে একটি পরিত্যাক্ত দ্বীপ রয়েছে। কেউ এখন বসবাস করে না। মৎসজীবীরা মাছ ধরতে যায়। ১৯৬০ সালে ৩/৪ শতাংশ ধবংশ হয়ে গেছে।  জম্বুদ্বীপের পোস্টঅফিস ব্রিটিশ আমলে কলকাতার ‘জিপিও’-র সমান ছিল।     
 সুন্দরবনের একটা আর্থ-ভৌগলিক এবং একটা আর্থ-সামাজিক ছবি আমরা তুলে ধরতে চেষ্টা করলাম। পরিসংখ্যান ভিত্তিক সুন্দরবনের ইতিবাচক দিকটা আমরা দেখতে পেলাম। ভাঙ্গনের কারণে চারটে গ্রাম জলের তলে হারিয়ে যাওয়ার তথ্য আমারা দিতে চেষ্টা করেছি। তাই আরও কঠিন কঠোর বাস্তব কিন্তু আমাদের অন্য গল্প, অন্য মানুষের ছবি চেনাচ্ছে। মাটির ক্যানভাস তির তির করে কাঁপছে। সম্প্রতি দিল্লীর একটি এনজিও সংস্থা সারা ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে ২৩ জন সাংবাদিকের একটি দল নিয়ে সাগরদ্বীপে তিনদিনের কর্মশালার আয়োজন করেছিল। ১৬-১৮ অগস্ট তিনদিনের কর্মশালায় আমার নিজেরও থাকার সুযোগ হয়েছে। সভাগৃহ থেকে বেরিয়ে আমরা সাগর দ্বীপের চারটে গ্রামে গিয়েছিলাম। স্বচক্ষে সাগর দ্বীপের আশপাশের গ্রামের মানুষের জীবন পাঁচালীর সাক্ষী থাকতে।  মূলত তিনটে গ্রাম যথাক্রমে ‘বেগুয়াখালি’ (লাইট হাউস), ‘সুমতিনগর’ এবং বোটখালি। এই তিনটে গ্রামের মানুষ ভাঙ্গনকে সঙ্গে নিয়েই ঘর সংসার করছে। নদীভাঙ্গনের গ্রাস থেকে বাঁচতে অসহায়েরমতো একটা অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে সরে এলেও অনেকেই এলাকা ছেড়ে ছলে যেতে চাইছে না। সাগর ব্লকের আধিকারিকদের অভিমত প্রতি বছর ১৫ মিটার করে গঙ্গাসাগর মেলা এগিয়ে আসছে। অদূর ভবিষ্যতে কপিলমুনি আশ্রম স্থানান্তরিত হতে পারে। এমন আশঙ্কাও করছেন তাঁরা।   
মুড়িগঙ্গার জল, জলের মাছ, সাপ, ব্যাঙ্গ আর মানুষ একসঙ্গে থাকতে অভ্যস্ত এই সব গ্রামে। গত কয়েক দশক ধরে স্থানীয় মানুষ নদী ভাঙ্গনের কারণে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার পিছনে সরে আস্তে বাধ্য হচ্ছে। সাগর দ্বীপের কাছাকাছি চলে আসতে বাধ্য হচ্ছে তাঁরা। লোকসভার বাজেট অধিবেশন চলাকালীন তৃণমূল কংগ্রেসের প্রবীণ সাংসদ সৌগত রায় সমুদ্রের জলতল বৃদ্ধি নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থান জানতে চান। এবং আমাদের রাজ্যের সুন্দরবনকে পর্যটনের জন্য আরও কতটা বাস্তবভাবে কাজে লাগানো যায় সেই বিষয়ে তিনি জানতে চান।  আমরা জানি জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রের জলতল বৃদ্ধি, চোরা শিকার এবং মানুষের তৈরি দূষণের জন্য সুন্দরবন বদ্বীপ সারা বিশ্বে অন্যতম বিপন্ন উপকূল অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত। এবং সেই কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যানগ্রোভ বনভূমি।
রোজনামচার ধারাপাত 
বেগুয়াখালিতে ভাঙ্গনের ছবির সঙ্গেই আমরা দেখতে পেলাম অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের দুই মহিলা মীন ধরছে। সঙ্গে দু’জন ৮-১০ বছরের বাচ্চা ছেলে। এই বর্ষার মরশুমে তাঁদের একমাত্র রোজগার। মীন বিক্রি করে এই সব পরিবারের মাসে পাঁচ-ছয় হাজার টাকা রোজগার হয়। কখনও আবার কিছুটা বেশিও হয়ে থাকে। অঞ্চলের মানুষের মূল রোজগার আসে চাষবাস থেকে। ৮৫% মানুষ চাষের উপর নির্ভর করে। কিন্তু যেসব অঞ্চলে জমির পরিমাণ কমে গেছে সেই অঞ্চলের বাড়ির পুরুষরা গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যায়। বছরে দু’মাস মধু সংগ্রহ করতেও দেখা যায় এই সব অঞ্চলের পুরুষদের। সরকার বিকল্প চাষ হিসেবে এলাকায় মধু চাষের জন্য উৎসাহ দিয়ে থাকলেও বাড়তি রোজগারের প্রয়োজনে কাজের খোজে ভিন রাজ্যে ‘পরিযায়ী’ শ্রমিকের কাজ করতে বাধ্য হয় এরা আগে গভীড় জঙ্গলে কাঠ কাটতে যেতেও দেখা যেত এতদ অঞ্চলের মানুষদেরকিন্তু রাজ্য সরকার জঙ্গলে কাঠ কাটা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। তাই এঁদের মাছ চাষ আর মধু সংগ্রহের উপর নির্ভর করতে হয়। জীবীকা নির্বাহের জন্য।
সুমতিনগরে স্থানীয় এক পঞ্চায়েতের উপপ্রধান আমদের সঙ্গে কথা বলছিলেন। তার কথায়, ‘মীন ধরা নিষিদ্ধ হলেও মীন ধরা বন্ধ করব কি করে? কারণ বিকল্প জীবীকার ব্যবস্থা করতে হবেতো!’ সুমতিনগরের নদীভাঙ্গন নিয়ে কিছুটা ক্ষোভ রয়েছে মানুষের মধ্যে। অভিযোগ গত ১০ বছর বার্ধক্যভাতা, বিধবাভাতা নতুন করে আর হয়নি। তবে মানবিকভাতা কেউ কেউ পাচ্ছে। সাগরে ৮টা গ্রাম পঞ্চায়েতের মধ্যে সুমতিনগর একটা জিপি। সুমতিনগরে বাড়ি আছে ৭০০০। প্রায় ৩৫ হাজার মানুষের বাস। মাছচাষ, কৃষি, পান চাষ এবং সবজি চাষই এলাকার মানুষের প্রধান জীবীকা। উপ প্রধানের দাবি ৯ কোট ৮০ লক্ষ টাকা বাজেট থাকলেও নদীবাঁধ দু’বছর টিকবে না। প্রয়োজন উন্নত প্রযুক্তি। সুমতিনগরের পরে আমরা গিয়েছিলাম জীবনতলা নামে একটা অঞ্চলে। এই অঞ্চলে লোহাচরা এবং ঘোড়ামারা দ্বীপ থেকে ‘পরিবেশ উদ্বাস্তু’ হয়ে যে সব মানুষ সাগর ব্লকে বসবাস করছেন তাঁরা আছেন। এই অঞ্চলের পুরুষেরা ‘পরিযায়ী শ্রমিক’ হিসেবে ভিন রাজ্য যেমন কেরল, গুজরাত, মহারাষ্ট্রে নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করে।
পরিবেশ বিঞ্জানীরা বলছেন, নদীভাঙ্গন, সাগরের ভাঙ্গনের কারণে যারা একটা অঞ্চল ছেড়ে অন্য এলাকায় চলে যেতে বাধ্য হয়, তাঁদের ‘পরিবেশ উদ্বাস্তু’ বলা যেতে পারে। উৎখাত হওয়া এই সব মানুষেরা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে এক অঞ্চল থেকে ভিন্ন অঞ্চলে যেতে বাধ্য হয়। ফলে এঁদের সামাজিক জীবনে এবং শারীরিকভাবেও পরিবেশগত প্রভাব পড়ে থাকে। ঘোড়ামারা, লোহাচরা বিশালক্ষ্মী মৌজার গরিব মানুষ নিজেদের বাসস্থান হারিয়ে সমতলে বসবাস করছে। যেমন কাকদ্বীপ, নামখানা এবং সাগরদ্বীপকে বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে তাঁরা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্কুল অব ওসিয়ানোগ্রাফিক্স স্টাডিজ’ বিভাগের তিনজন অধ্যাপক তুহীন ঘোষ, ঋতুপর্ণা হাজরা এবং অনির্বাণ মুখোপাধ্যায়ের গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। সাগরের বিধায়ক বঙ্কিম হাজরার বক্তব্য সুনামী এবং আয়লার কারণে সাগর ব্লকে ২৫,০০০ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। সাগর ব্লকে এ পর্যন্ত ৪০০০ বাড়ি ভেঙ্গেছে। ১৭৬ কিলোমিটার নদী বাঁধ নির্মাণের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের ১৩৩৯ কোট টাকা দেওয়ার কথা ছিলকিন্তু মাত্র ১৭০ কোটি টাকা দিয়েছে। রাজ্য সরকার ৯১৫ কোটি টাকা দিয়েছে। সেই টাকা দিয়ে নারকেলের ছোবড়ার রোল দিয়ে বাঁধ তৈরির কাজ পরীক্ষামূলকভাবে করা হচ্ছে। প্রতিটি গ্রাম পঞ্চায়েতের বাঁধের ধারে নারকেল গাছ লাগানো হচ্ছে আসামের মাজুলির আদিবাসীদের অভিঞ্জতাকে কাজে লাগিয়ে।
নদীবাঁধ ভাঙ্গনের জন্য স্কুল ছাত্রদের স্কুলছুট হওয়ার কথা বলছিলেন ধবলাট লক্ষণ পরিবেশ উচ্চ বিদ্যালয়ের রাষ্ট্রপতি পুরষ্কারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শান্তনু গায়েন। ভাঙ্গনের কারণে কয়েকজন ছাত্র স্কুলে আসা বন্ধ করে দিয়েছিল। শান্তনুবাবু একজন সহ শিক্ষককে সেই সব ছাত্রদের বাড়ি পাঠান। একজন ছাত্র বলে, ‘স্যার আমার সার্টিফিকেট হারিয়ে গেছে। আপনি বলছেন স্কুলে যেতে। কি করে যাব? স্কুলের সব সার্টিফিকেট, বইখাতা জলের তলায়।’ ছাত্রটিকে পরে প্রধানশিক্ষক শান্তনুবাবু বিনা খরচে  ছাত্রাবাসে রেখেছেন। স্কুলে ১৮টি পরিবেশ প্রকল্পের একটিতে যুক্ত করে পড়ার ব্যবস্থা করেছেন। ভবিষ্যৎ আকাশ থেকে আলো চুঁইয়ে পড়ছে। সেই আলোর ঝলকেই আমাদের পথ খুঁজে নিতে হবে।
(ছবিগুলি তুলেছেন চিত্র সাংবাদিক অম্লান বিশ্বাস)                           

Comments

Popular posts from this blog

দু’জন বাঙালি বিঞ্জানীর গণিতিক পদার্থ বিঞ্জানে বিশ্ব বিখ্যাত আবিষ্কার

মধ্যরাতের স্বাধীনতা ও আহত বিবেক

সার্বভৌমত্বের বৃহত্তর গণতন্ত্র আবার সাবেক পথ চেনাবে!