বাংলার চিলেকোঠায় আজও মানবতা খুঁজে পাই
দীপেন্দু চৌধুরী
আজ থেকে কত বছর আগে হবে? দিনটা ছিল ৬ ডিসেম্বর ১৯৯২
সাল। ২৭ বছর আগে। আমরা তখন কলকাতার কসবায় ভাড়া বাড়িতে থাকি। সকাল তখন আটটা ন’টা
হবে। পাড়ার কয়েকজন ছেলে এসে আমার মায়ের সঙ্গে কথা বলল। আমার সঙ্গেও কথা বলল। তারপর
দু’টো পরিবারের দু’জন প্রাপ্তবয়স্ক মহিলা পাঁচ ছ’জন বাচ্চা ছেলে মেয়ে নিয়ে আমাদের বাড়িতে সারাদিন
থেকে গেল। ৬ ডিসেম্বর কি কারণে আমরা মনে রেখেছি সেটা সবাই জানি। পাড়ার আমার পরিচিত
ছেলেরা এই রকম অনেক নির্ভরযোগ্য পরিবারের কাছে আপাত নিরীহ ভিনধর্মী মানুষদের
নিরাপত্তা এবং অস্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দিতে পেরেছিল। নব্বইয়ের দশক। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু। সেই বছরে কলকাতা শহরে তথা আমাদের বাংলায় তথাকথিত ‘ঘৃণা’ এবং অমানবিক
আক্রমণের ঘটনা খুব বড় কিছু ঘটেনি।
দেশভাগের পরে কলকাতা শহরে যে অশান্তির ইতিহাস আমরা পড়ি, অথবা চলচ্চিত্রে, সাহিত্যে
যে সামাজিক বন্ধনের ছবি আমরা খুঁজে পাই সেটা আমাদের এই বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য।
স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলার মানুষ ‘উদ্বাস্তু
স্মৃতি’, বিভেদের যন্ত্রণা নিয়ে কলকাতাকে সামাজিক করে নিয়েছে। বাংলায় উদ্বাস্তু
সমস্যা, তেভাগা আন্দোলন, ষাটের দশকের খাদ্য আন্দোলন, ফ্রান্সে ছাত্র আন্দোলন, কলকাতায় ছাত্র আন্দোলন,
সত্তর দশকের উজ্জ্বল প্রেক্ষাপট আমাদের ব্যক্তিত্ব গড়ে দিয়েছে। সাম্প্রদায়িক
সম্প্রীতির ঐক্যতান আমরা একতারা হাতে বাজাতে শিখেছি বিংশ শতাব্দীর সামাজিক
অভিভাবদের নিঃশব্দ পাহাড়ায়। এবং একুশ শতাব্দীর বাংলার এক জন জননেত্রীর প্রশ্রয়ে।
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কয়কটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে
পুলিশকে কড়া নির্দেশ দিয়েছেন গুজব, বিদ্বেষমূলক প্রচার বন্ধ করার জন্য। এখন ভরসা
পাচ্ছি কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গাঁধির বিশ্বায়ন উত্তর প্রজন্মের ভাষায়। তিনি
সম্প্রতি বলেছেন, ‘মহাবীর, বুদ্ধ, অশোক ও গাঁধীর দেশে এখন ঘৃণার পরিবেশ তৈরি
হয়েছে।’
পুলোয়ামায় সিআরপিএফ জওয়ানের উপর সন্ত্রাসবাদী
হামলা এবং ৪৯ জন জওয়ানের মৃত্যুতে ভারতে চেনা অথবা অচেনা এক ‘জাতীয়তাবাদ’ সম্প্রতি
জেগে উঠেছে। ভারত একটি সার্বভৌম স্বাধীন গণতান্ত্রীক রাষ্ট্র। সেই রাষ্ট্রে
‘জাতীয়তাবাদ’-এর চেতনা জাগ্রত হলে আমাদের আপত্তি করার কিছু নেই। কিন্তু জাতীয়তাবাদের
হুজুগে রাজনৈতিক মুনাফার মঞ্চকে ব্যবহার করব? সেই হুজুগকে পশ্চিমবঙ্গ নামক সহিষ্ণু
এক জনপদ রুখে দিতে জানে। আগলে রাখতে জানে। ১৯৪৭ উত্তর বাংলায় আমারা সেটা পেরেছি। গত
শতাব্দীর আশির দশকে আমরা পেরেছি। নব্বইয়ের দশকে একাধিকবার আমাদের ‘চিলেকোঠা’-এর
আত্মীয়তা আমরা দেখাতে পেরেছি। নতুন শতাব্দীর প্রথম দশকের অপ্রয়োজনীয় আস্ফালনে আমরা
ভয় পাইনি। আমাদের নজরুল- রবীন্দ্রনাথ-সুকান্ত- সুভাষের
বাংলা, আউল-বাউল, সুফি-সন্ন্যাসীর বাংলা, লালন সাঁইয়ের বাংলা, কবি সুভাষ
মুখোপাধ্যায়ের বাংলা ভয় পায় না। বৈষ্ণব সাহিত্যের বাংলা আপ্যায়ন জানে। চিলেকোঠার
মানবিক আবেদনে।
একুশ শতাব্দীর মল সংস্কৃতির বাংলা, সোশ্যাল মিডিয়া
নামক এক আগ্রাসী তীব্র গতিশীল অন্তর্জাল নির্ভর বাংলার জনপদও নিজেদের বিশ্বাসে
দৃঢ়তার পরিচয় দিল আবার। নদিয়ার তাহেরপুরে শাল বিক্রি করেন জাভেদ আহমেদ খান। জম্মু-কাশ্মীরের
বদগামের বাসিন্দা জাভেদ। গত দশ বছর তিনি শাল বিক্রি করছেন এতদ অঞ্চলে। ২০
ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের আগের দিন উগ্র ‘জাতীয়তাবাদ’-এর সমর্থক
একদল যুবক জাভেদকে আক্রমণ করে। স্থানীয় কয়েকজন মানুষ এগিয়ে এলেন। সম্প্রীতি এবং
সংস্কৃতির চিরায়ত বাংলার, সহিষ্ণু বাংলার মানুষ তাঁরা। এগিয়ে গেলেন। প্রথমে থানায়
খবর দিলেন। পুলিশ এসে উদ্ধার করে জাভেদ এবং তার তুতো ভাই মেহরাজউদ্দিনকে। এই
পর্যন্ত সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত খবর। কিন্তু ঘটনার পরে রক্তাক্ত জাভেদের বয়ান আমাদের
সহিষ্ণু বাংলার বিবেককে চাগিয়ে দিয়েছে। রক্তাক্ত জাভেদ বলছে, পশ্চিমবঙ্গের মানুষের
উপরে পূর্ণ আস্থা রয়েছে আমাদের।
পশ্চিমবঙ্গের একটি জেলার ঘটনা এটা। সংবাদ মাধ্যমেও
প্রকাশিত। আরও অনেক বিছিন্ন ছোট খাটো ঘটনা হয়ত সংবাদ মাধ্যমে উঠে আসেনি। কিন্তু
কলকাতা? সংস্কৃতির গর্ব করা কলকাতা। দু’দশকের বেশি এই শহরে আছেন এক কাশ্মীরী
চিকিৎসক। পূর্ব কলকাতার বাসিন্দা সেই চিকিৎসককে ভারতের নতুন ‘জাতীয়তাবাদ’-এর
ঝান্ডাধারী কয়েকজন ঠান্ডা শীতল গলায় বলল, ‘’এটা আপনার দেশ নয় চলে যান’’।
তারপরে প্রার্তভ্রমণে বেরিয়েও ব্যাঙ্গ, বিদ্রুপ, কটূক্তি
শুনতে হয় কলকাতা শহরের নামকরা কাশ্মীরি এক হ্রদরোগ বিশেষঞ্জকে। এই ছবির সঙ্গে
তাহেরপুরের ছবিটার মূল উদ্দেশ্য এক ছিল। কিন্তু আক্রমণের ধরণটা নগরকেন্দ্রিক। এবং
এতটাই আভিজাত্যের মোড়কে ঢাকা আক্রমণ, আমাদের শুনলে শিউরে উঠতে হয়। ডাক্তারবাবুর
পাশে কয়েকজন স্থানীয় মানুষ এসে দাঁড়ায়। তারপরেও আক্রমণ নেমে আসে তার মেয়েদের
স্কুলে। ডাক্তারবাবুর মেয়েদের অভিযোগ কয়েক জন সহপড়ুয়া তাদের পাশে বসতে অস্বীকার
করে। শিশুমনে হঠাত অপরিচিত এক সংস্কৃতির ধাক্কা ওদের স্বাভাবিক দৈনন্দিন জীবনে,
সামজিক জীবনে প্রভাব ফেলে, যথেষ্ট প্রভাব ফেলে। দুই বোনের আচরণে ডাক্তারবাবু লক্ষ
করেন। চিরসবুজ চিরসুন্দর, নীলাভ আকাশের মুক্ত বাতাস ওদের কাছে কিছুক্ষণের জন্য,
কিছুদিনের জন্য অচেনা হয়ে যায়। ওরা রবীন্দ্রনাথের মিনুর মতো আমাদের বাংলার মেয়ে।
ওরা অনুভূতি হারিয়ে ফেলেছিল। মূক হয়ে গিয়েছিল কয়েকদিনের জন্য। খবর যায় রাজ্য শিশু
সুরক্ষা কমিশনের চেয়ারপার্সন অনন্যা চক্রবর্তীর কাছে।
অনন্যা চক্রবর্তী যে কথা সংবাদ মাধ্যমকে বলেছিলেন,
‘বিষয়টা অত্যন্ত স্পর্শকাতর ছিল। শিশু মনে আঘাত লেগেছিল। এবং সেটাই স্বাভাবিক।
বিষয়টা আমাদের নজরে আছে।’ দুটি ঘটনা ভিন্ন। রাজ্য পুলিশ সূত্রে খবর এই ধরণের ২২ টি
ঘটনা ঘটেছে আমাদের রাজ্যে। তাহেরপুরের জাভেদের মতো একই রকম হয়ত। শুধু আক্রমণের ভাষা, ভঙ্গিমা আলাদা। এই
কলকাতা শহরের অলিগলির গোলক ধাঁধাঁয় এরকমটা হওয়ার কথা নয়। শহরের বাবুরা গাঁ গঞ্জে
আগেও গেছেন। এখনও যান। এই বাংলার শিকড়ে অবিভক্ত বাংলার মাটি আছে। যে মাটি এতটাই
উর্বর বিভিন্ন দেশের ফুল, ফল আবাদ হয়েছে। অবিভক্ত বাংলার মাটিতে রবীন্দ্রনাথ
আমাদের রাখি বেঁধে দিয়ে গেছেন। আমরা আমাদের চিনি বিভিন্ন ধর্মের সহঅবস্থানে, আমরা
আমদের চিনি আমাদের সাংস্কৃতিক বিনিময়ে। কবির ভাষায় তোমার উঠোনে সাদা আলপনায়
লক্ষ্মীর পদচিহ্ন পড়ুক। পট শিল্পীর তুলিতে আঁকা সত্যপীরের দরগা, সত্যনারায়ণের
বাংলা।
বিশ্বায়ন সংস্কৃতি বাংলার ঐতিহ্যে আঘাত আনলেও
আমাদের শিকড় প্রোথিত অনেক গভীরে। ভারতীয় ইতিহাস কংগ্রেসের ৩৩তম অধিবেশনের প্রধান
সভাপতি হিসেবে ইতিহাসবিদ সুশোভন সরকার যে ভাষণ লিখেছিলেন, তাতে তিনি বলেছিলেন,
দেড়শ বছর ব্যাপী সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামের ভেতর দিয়ে যে সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে,
সেই ঐক্যের ওপর ভারতবর্ষ গড়ে উঠেছে- নানা জাতিগোষ্ঠী থেকে একটি জাতিতে পরিণতির
ঐক্য। তিনি বিশ্বাস করেন সেই ঐক্যসাধনায় আমাদের বাংলার একটা কেন্দ্রীয় ভূমিকা ছিল।
অন্যদিক থেকেও অধ্যপক সরকার বলেছেন যে, ভারতীয় সংস্কৃতির উপাদানগুলির সঙ্গে আমাদের
বাংলার উপাদানগুলির অনেক কিছু মিলে যায়।
স্বাধীনতা পূর্ব ভারতে যে ধরণের গোষ্ঠী সংঘর্ষের
ঘটনা আমারা জানি, তার তিক্ত অভিঞ্জতাও আমাদের হয়েছে। আমাদের অবিভক্ত বাংলা, ভারতে
হিন্দু প্রধান প্রতিটি গ্রামে বিশেষ বিশেষ সময়ে পীরের দরগায় সিন্নি চড়ানোটা যেখানে
নিয়মিত হয়, মুসলমান লেদ মিস্ত্রীর হাতে বিশ্বকর্মা পূজো, সরস্বতী পুজোর সময় স্কুল
কলেজে মুসলিম ছাত্রছাত্রীদের অংশ গ্রহণ। ‘শেষ প্রশ্ন’ উপন্যাসে শরৎচন্দ্র স্বাধীনতা
সংগ্রামী রাজেন্দ্রকে দিয়ে বলিয়েছেন, ‘সর্বপ্রকার মতকেই শ্রদ্ধা করতে পারে কে
জানেন? যার নিজের কোনও মতের বালাই নেই।‘’ বর্তমান সময়ে বাউল দর্শনের সঙ্গে
শরৎচন্দ্রের কথা মিলে যেতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক বাধ্য বাধকতায় আমরা কি চুপ করে বসে
থাকতে পারি? উন্নয়নশীল দেশ ভারতীয় গণতন্ত্রের ভিত তৈরি করে দিয়ে গিয়েছিলেন নেহরু
আম্বেদকরেরমতো স্বনামধন্য ব্যক্তিরা। ভারতের সাংবিধানিক সংস্থাগুলি আজ আক্রান্ত।
ভেঙ্গে পড়ছে একটার পর সংস্থা। বলা ভালো ভেঙে দেওয়া হচ্ছে সে গুলিকে। এই অবস্থায়
সামাজিক বন্ধনকে ভেঙে ফেলাটা অনেক সহজ মনে হচ্ছে শাসকের কাছে। যদিও আশার আলো আমরা
দেখতে পাচ্ছি। ‘ইন্দিরা ইজ ইন্ডিয়া’ যুগের ‘কমিটেড ব্যুরোক্রাসি’ বা ‘কমিটেড জুডিশিয়ারি’
থেকে উন্নত গণতন্ত্রে উত্তীর্ণ হয়েছে আমাদের দেশ। বর্তমান সময়ের হিংসা, ঘৃণা নামক
তথাকথিত ভারতের সীমান্তরেখা ভেঙে নতুন ভারতের জন্য তৈরি হচ্ছে ‘নিউ ইয়ুথ ইন্ডিয়া’।
সেই কারণেই কি গাঁধি নেহরু পরিবারের বর্তমান প্রজন্ম বলছে আমাদের বাবাও সন্ত্রাসের
শিকার? এই লেখা যখন লিখছি খবর পেয়েছি। সুপ্রিম কোর্ট দেশের সর্বত্র কাশ্মীরীদের
সুরক্ষার দায়িত্ব নিতে বলল কেন্দ্রীয় সরকার এবং পশ্চিমবঙ্গ সহ ১০ টি রাজ্যকে। আমাদের
উদ্বেগ প্রমাণিত হল দেশের শীর্ষ আদালতের এই রায়ে।
রাজনৈতিক বিশেষঞ্জদের অভিমত এই হিংসাত্বক
গণতন্ত্রের ছবি থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার রাস্তা আমি আমরা সবাই খুঁজছি। শাসন প্রথাকে
চিহ্নিত করতে চাইছি। শাসককে চিহ্নিত করতে চাইছি। কেউ কেউ ফিরে যেতে চাইছে গত শতাব্দীর তিরিশের
দশকের রাজনৈতিক ঘরানায়। যেটা ছিল ভ্রাম্যমাণ রাজনীতি। আবার পাশাপাশি জন জীবনের
বিভিন্ন উপাদানকে একত্রিত করে অন্তর্ভুক্ত করা যায় কিনা সেটাও পরীক্ষা নিরীক্ষা
করে দেখতে চাইছে একদল প্রগতির পক্ষের মানুষ। আসলে চিনতে হবে শত্রুর গোপন ডেরা এবং
সংস্কৃতি। তবেই নতুন সমাজ তৈরির কৃতকৌশলকে আমরা সমন্বয় করতে পারব।
রাষ্ট্রবিঞ্জানীরা বলছেন ভ্রাম্যমান রাজনীতি বা রাজনৈতিক নেতৃত্ব দীর্ঘমেয়াদি
রাজনীতির উপর নির্ভর করে থাকে না। এই রাজনীতি তাৎক্ষনিক। কৌশল নির্ভর। সেই কৌশল
আমাদের বারে বারে খুঁজে দেখতে হবে। 





Comments
Post a Comment