আগামীর কথা ওরা বলবে


দীপেন্দু চৌধুরী
সময় চলে গেছে দূর সুদূরের পানে। সময় ডাকে কালের নিয়মে। বর্তমান খুঁজতে থাকে অতীতের ধ্রুবতারা। অনালোকিত সময়ের আকাশে আলোর খোঁজে তারুণ্যের ভাষা আজও ছুয়ে দেখতে চায়, প্রশ্ন করে বলতে চায় তোমা ছাড়া, তোমাদের ব্যতিত বাংলা সাহিত্য, বাংলার সংস্কৃতি, বাঙালির কৃষ্টি আজও পথহারা পথিক। আমদের তারুণ্যের ঔদ্ধত্য যতই থাক তবু আমরা হতে চাই উত্তর প্রজন্ম।
আজ দিগন্ত রেখা অনেকটা অনেকটা বদলে গেছে। বর্তমান জীবনযাত্রা, মূল্যবোধ, সেদিনের অন্বয়ের সঙ্গে মেলে না। তথাপি আমাদের যেতে হয় সান্তনা খোঁজার জন্য শুধুমাত্র নয়, আমাদের যেতে হয় সামগ্রিক জীবনের কথা যারা বলতে চেয়েছেন তাঁদের কাছে। আজও যখন আমাদের মন কেমন করে আমরা চলে যাই রবি ঠাকুরের কাছে, জীবনানন্দের কবিতায় এবং বিভূতিভূষণের ঘাটশিলায়।
১২ জানুয়ারি সেই শিকড়ের খোঁজে জড়ো হলেন কলকাতা সহ কলকাতার উপকন্ঠের একদল সাহিত্য মনন নাগরিক। সংস্কৃতি সচেতন কলকাতার নাগরিক। এদিন দেজ প্রকাশনা আয়োজন করেছিল ‘নবনীতা ৮১’ শিরনামে লেখিকার জন্মদিনের অনুষ্ঠান। নবনীতা দেবসেনের জন্ম ১৯৩৮ সালের ১৩ জানুয়ারি। দক্ষিণ কলকাতার দক্ষিণের বারান্দা আর্ট গ্যালারির ‘আকার প্রকার’-এর খোলা উঠোনে ছিল এদিনের অনুষ্ঠান সমাবেশ বলে দিচ্ছিল শহরের ‘নাগরিক সাহিত্য’ ছাপিয়ে আজও মানুষ আছেন কলকাতায়, মানুষ থাকেন মানবিক গুণ নিয়ে। আমরা গর্ব বোধ করছিলাম। অনুষ্ঠানের আটপৌড়ে উঠোন ছাপিয়ে ভিড় আর বিদগ্ধ মানুষের আগ্রহ আমাদের বুঝিয়ে দিল সাহিত্যিক, কবি, প্রাবন্ধিক এবং সমাজ সচেতন নাগরিক নবনীতা দেব সেন আজও প্রাসঙ্গিক। সাহিত্যরসিক এবং বন্ধুবর অধ্যাপক অমিয় দেব অনুষ্ঠানের প্রাক কথন শুরু করলেন দেজ প্রকাশনা সংস্থার সি ই ও শুভঙ্কর দের আহ্বানে। শুভঙ্কর জানালেন নবনীতার অন্যতম শিক্ষক অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত আস্তে না পারলেও তাঁর প্রিয় ছাত্রীকে নিয়ে কয়েকটি কবিতা লিখে পাঠিয়েছেন। তাঁর থেকে একটি পাঠ করেন শুভঙ্কর। ‘নবনীতা তার মাথা নুয়ে আছে,/ ত্রেতা যুগ থেকে আমরা ক’জন নেমে এসে দলে দলে/ তাকে ঘিরে আছি আশীর্বাদের ছলে’’- ।  
অধ্যাপক অমিয় দেবের কথা থেকে আমরা জানতে পারলাম ১৯৫৬ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বুদ্ধদেব বসু প্রতিষ্ঠিত তুলনামূলক সাহিত্যবিভাগের ছাত্রী নবনীতা। তার সহপাঠী ছিলেন অমিয় দেব, মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় সহ বাংলা এবং ইংরেজি সাহিত্যের আরও দিকপালেরা। এরা ছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্যের প্রথম বর্ষের ছাত্রছাত্রী। তুলনামূলক সাহিত্যের ছাত্রী নবনীতার গবেষণার বিষয় ছিল সীতার বিভিন্ন আখ্যান। তিনি অধ্যাপনা করেছেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগেই। নবনীতা পড়িয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে।  
নবনীতা দেবসেন ১৯৭৬ সালে লেখেন আমি অনুপম উপন্যাস। শারদীয় আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল সেই আখ্যান সমালোচকরা বললেন এই উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে নকশাল বাড়ির প্রেক্ষাপট নিয়ে লেখা  প্রথম উপন্যাস। যে উপন্যাস আমি নিজেও পড়েছি। এই উপন্যাসের সূত্র ধরেই ফিরে যাওয়া যায় সেদিনের অনুষ্ঠানের আলোচনায়। অমিয় দেব জানান, আমরা একটা আড্ডা এবং বিতর্কের ক্লাব করেছিলাম। যেটাকে স্টাডি সার্কেল বলা যায়। লাল পলাশে রাঙানো সেই আড্ডা ছিল অনেক অনেক উদার। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আমরা তর্ক করেছি। বিতর্ক হয়েছে। নবনীতা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়িয়ে কলকাতা শহর, শহর ছাড়িয়ে দিল্লি চলে গেল ডিবেট করতে। বিদেশ থেকে ডাক পেল বিভিন্ন বিষয়ে ডিবেট করার জন্য।
অসুস্থ শরীর নিয়েও ৮১ বছরের তরুণী মনে করালেন। নবনীতা বললেন, আমাদের ওই ডিবেট ক্লাবের সদস্য ছিলেন অমর্ত্য সেনও।    
অমিয় দেব আরও বলেন, ‘’আমরা দু’জনে ভাইবোন পাতিয়েছি। পঞ্চাশ বছর ধরে নবনীতা আমাকে ভাইফোঁটা দিচ্ছে। নবনীতার বিখ্যাত বাবা-মার সঙ্গে বুদ্ধদেব দেব বসুর পারবারিক বন্ধুত্ব ছিল। সেই সুবাদে নবনীতা বুদ্ধদেব বসুর মেয়েরমতো ছিল। ওর নাম রাখারও একটা ইতিহাস আছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাধারানী দেবের নাম রেখেছিলেন নবনীতা। কিন্তু তিনি নিজে সেই নাম গ্রহণ না করে মেয়ের নাম রাখলেন ‘নবনীতা’।‘’ 
লেখিকার বাংলা সাহিত্যে প্রবেশ ‘প্রথম প্রত্যয়’ কাব্যগ্রন্থ দিয়ে। তারপর একটার পর উপন্যাস, গল্প কবিতার বই প্রকাশ হয়েছে তাঁরলিখেছেন একশোর বেশি বই। প্রবন্ধ, গল্প, কবিতা, উপন্যাস সহ বাংলা ও ইংরেজিতে তিনি একাধিক বই লিখেছেন। সম্মানিত হয়েছেন অকাদেমি এবং পদ্মশ্রী পুরস্কারে। এদিনের অনুষ্ঠানে দেজ প্রকাশনা সংস্থা থেকে লেখিকার ‘ভালো-বাসার বারান্দা’ সিরিজের চতুর্থখন্ড প্রকাশিত হল। এরপরেই ছিল সঞ্চালক চৈতালি দাসগুপ্তের সঙ্গে আলাপচারিতা। চৈতালি আলাপ শুরু করার আগে কবি নবনীতার ‘অসহিষ্ণুতা’-কে বিষয় করে লেখা দুটি কবিতা পাঠ করেন। একটি লেখা ২০০২ সালে, দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা প্রসঙ্গে। তারপর চৈতালি সরাসরি প্রশ্ন করলেন প্রবীণ লেখিকাকে। চৈতালির প্রশ্ন ছিল বর্তমান দেশের অস্থির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট প্রসঙ্গে। উত্তরে নবনীতা বললেন, ‘’বাচ্চাদের সুন্দর পৃথিবী হবে। আমরা যা দেখছি সেগুলো মেনে নেওয়া আমাদের পক্ষে কঠিন। যেদিকে তাকাই পরাজয় দেখি। কিন্তু ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা আছে। তাঁরা আমাদের ভবিষ্যৎ। আগামীর কথা ওরা বলবে। ভারতের বাইরে কোথায় আছে আদর্শ? কোথায় আছে মানবতা? এই বাচ্চাদের জন্য আমরা উন্নত আকাশ চাই। আমি বিশ্বাস করি কখনই হাল ছেড় না। হাল ছাড়া উচিৎ নয়।‘’
আবারও উচ্চারণ করি হাল ছেড়না বরং কন্ঠ ছাড় জোরে। শিল্পী, সাহিত্যিক গায়কদের তুলি, কলম আর কন্ঠ যে কথা বলে। নবনীতা আপনি সুস্থ থাকুন। আপনার সঙ্গে আমরাও শপথ নিচ্ছি ছোটদের সঙ্গে থেকে আগামীর কথা শোনার জন্য। ভোর প্রতিদিন হয় ভোর প্রতিদিন হবে। অন্ধকারে রাতজাগা তারাদের হাতছানিতে।                     

Comments

Popular posts from this blog

দু’জন বাঙালি বিঞ্জানীর গণিতিক পদার্থ বিঞ্জানে বিশ্ব বিখ্যাত আবিষ্কার

মধ্যরাতের স্বাধীনতা ও আহত বিবেক

সার্বভৌমত্বের বৃহত্তর গণতন্ত্র আবার সাবেক পথ চেনাবে!