ওরা লাঠি মারে আমরা সেবায় বিশ্বাস করি
দীপেন্দু চৌধুরী
গুরু নানকের দর্শন ‘পহেলে লঙ্গর পিছে সঙ্গত’। একসাথে বসে খাও। জাতপাতের
বেড়া ভাঙ। দিল্লিতে কনকনে ঠান্ডা। কুয়াশার চাদর ঢেকে দিয়েছে মানবতা। সূর্যের আলো ঠিক
মত আসছে না। টিয়ার গ্যাসের শব্দে কান পাতা যাচ্ছে না। বিতর্কিত তিনটে কৃষি বিলের প্রতিবাদে লক্ষ লক্ষ
কৃষক দিল্লির রাজপথে। খোলা আকাশের নীচে। ৪ ডিসেম্বরের বৈঠকেও কেন্দ্র আন্দোলনকারী
কৃষক সংগঠনের নেতৃত্বের সঙ্গে সাত ঘণ্টা
আলোচনা করেও রফাসূত্র বের করতে পারেনি। এতটাই অনড় ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলনের
নেতৃত্ব। ওই দিন বৈঠকের বিরতিতে কেন্দ্রের দেওয়া মধ্যাহ্নভোজের আমন্ত্রণ ফিরিয়ে
দিয়েছে কৃষক নেতারা। মাটির সন্তান সভাঘরের পাশে একটি ঘরে মেঝেয় বসে নিজেদের আনা
খাবার খেলেন ভারতের ‘অন্নদাতারা’। তবু সমঝোতা করেননি। বাইরে তাদের জন্য অপেক্ষা
করছেন লক্ষ লক্ষ কিসান-কৃষক ভাইয়েরা। তারা খোলা আকাশের নীচে শপথ নিয়ে বসে আছে।
শত্রুপক্ষকে চিহ্নিত করতে শত্রুর সঙ্গে আলোচনায় বসাটা গণতান্ত্রিক
রীতিনীতি। কিন্তু শত্রুর দেওয়া মধ্যহ্নভোজ গ্রহণ করলে শত্রুপক্ষ দুর্বল ভাববে।
আন্দোলন ভাঙার বিভিন্ন ফন্দিফিকির খুঁজতে পারে কৌশলী এবং বলবান মোদী সরকার। তাই
কৃষক নেতারা ৪ ডিসেম্বর মোদী সরকারের দেওয়া মধ্যহ্নভোজের আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দিয়েছে।
গত কয়েকদিন মোদীর পুলিশ বলেছে লাঠি খাও আজ বলছে পাঁচতারা রসুইঘরের খাবার খাও। এক
প্রকার বিদ্রুপ মনে হয়েছে আন্দোলনরত কৃষক নেতৃত্বের কাছে।
পঞ্জাবের কিসান সমাজ গুরু নানকের দর্শনে বিশ্বাস করে। গাঁধীজীর মত পথে
বিশ্বাস করে। অহিংস আন্দোলনে বিশ্বাস করে তারা। সেই বিশ্বাসের আন্তরিক এক ছবি সারা
ভারত দেখেছে। ২৭ নভেম্বর ছিল গুরু পূর্ণিমা। গুরু নানকের জন্মদিন। কৃষি বিল
প্রত্যাহারের দাবি নিয়ে পঞ্জাব থেকে দিল্লির রাজপথে এসেছেন পঞ্জাবের কিসানেরা।
হরিয়ানা-দিল্লি সীমান্তে প্রায় এক লাখ ট্রাক্টরকে আটকে রেখেছে দিল্লি পুলিশ। কয়েক
লক্ষ কৃষকের আন্দোলনকে ভাঙতে কাঁদানে গ্যাসের গোলা ছুঁড়ছে পুলিশ। তীব্র শীতে জলকামানের সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ আন্দোলন করছে কৃষকরা। তবু গুরু নানকের জন্মদিনে
অত্যাচারী পুলিশকেই হাসি মুখে পাত পেড়ে খাইয়েছেন পঞ্জাবের আন্দোলকারী কৃষকেরা।
কর্তব্যরত পুলিশকে দিলেন পানীয় জল। ব্যাতিক্রমী এই দৃশ্যের ছবি ছড়িয়ে পড়ল সোশ্যাল
মিডিয়ায়।
বিরল এই দৃশের ছবি নিজের টুইটার হ্যান্ডেলে দিয়ে সিপিএম নেতা সীতারাম
ইয়েচুরি টুইট করেন, ‘’আন্দোলনকে দমিয়ে দিতে যে বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে, খাবার
দেওয়া হচ্ছে তাদেরই। প্রধানমন্ত্রী মোদী দেখে রাখুন, প্রকৃত ভারত জাগছে। যে
অন্নদাতারা আমাদের বাঁচিয়ে রাখেন, তাঁদের কথা শুনুন।‘’ কংগ্রেস নেতা মনীশ তিওয়ারী
টুইট করেন, ‘’এই সংস্কৃতি পঞ্জাবের নিজস্ব ঘরানার। এই ঐতিহ্য কত কয়েক শতাব্দীর
ঐতিহ্য। খাওয়ানোর এই রেওয়াজ পঞ্জাবের পরিচিতি। এটাকেই সেবা ধর্ম হিসেবে পঞ্জাবী
সমাজ মনে করে।‘’
তার প্রমাণ আমরা পেয়েছি। ঐতিহাসিক মিছিলে হাঁটা কৃষকদের জন্য লঙ্গর খুলে খাবারের
ব্যবস্থা করে চলেছে গুরুদ্বার। পথের ধারে গরম রুটি-তরকারি তৈরি করে খাওয়াচ্ছেন
সাধারণ মানুষ। সেবা পরম ধর্ম। ছবিতে দেখা গেছে হরিয়ানার গুরুদ্বারের লঙ্গরে খেতে
বসেছেন পুলিশ জওয়ানরা। তাঁদের পরম যত্নে খাবার পরিবেশন করে খাওয়াচ্ছেন কৃষকরা। ওয়াহে
গুরুর নির্দেশ মেনে তারা পঞ্জাবী ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। গুরু নানকের নির্দেশ
‘পহেলে লঙ্গর পিছে সঙ্গত’। পঞ্জাবী সমাজে কোনও জাতিভেদ প্রথা নেই। এক সাথে বসে
খাও। জাতপাতের বেড়া ভাঙ। মধ্য যুগের জাতপাতের দ্বন্দ থেকে বেরিয়ে আসতে গুরু নানক শুরু করেছিলেন সামাজিক আন্দোলন। যে
আন্দোলনের ইতিহাস সারা বিশ্ব আজও উচ্চারণ
করে। ‘গুরু কা লঙ্গর’-রের সংস্কৃতি বলে আগে একসাথে খাওয়াদাওয়া কর তারপর সঙ্গত কর।
মানে আনন্দ কর। সামাজিক বন্ধনকে এক সূত্রে গেঁথে দিয়েছিলেন গুরু নানক। বাংলার ‘বাউল-ফকির’
সমাজেও একই সংস্কৃতির প্রচলন আছে।
আমাদের মনে পড়বে গাঁধিজীর ‘ডান্ডি অভিযান’-র প্রসঙ্গ। যাকে লবণ সত্যাগ্রহ বলা
হয়ে থাকে। এই আন্দোলন করার সময় গাঁধিজী গুরু নানকের পথ অনুসরণ করেছিলেন। মাত্র ৭৮
জন সত্যাগ্রহীকে নিয়ে গাঁধিজী আন্দোলন শুরু করেছিলেন। একটা করে গ্রাম পার হয়ে যান
শয়ে শয়ে মানুষ চলে আসেন। সঙ্গে ব্রিটিশ সরকারের পুলিশ। যে গ্রামে এসে রাত হয়ে যেত
গাঁধিজী সেই গ্রামেই বিশ্রাম নিতেন। সত্যাগ্রহীরাও সেই গ্রামে বিশ্রাম নিতেন। তাঁদের
খাওয়ার ব্যবস্থা করত স্থানীয় মানুষ। সত্যাগ্রহীরা যেমন খেতেন, খাওয়ানো হত ব্রিটিশ
পুলিশকেও। সত্যাগ্রহীদের উপর ব্রিটিশ সরকারের যে পুলিশ লাঠিচার্জ করছে রাতে সেই
পুলিশকে সত্যাগ্রহীরা খাওয়াচ্ছে। সেই সময় রয়টার্স-র বিদেশী এক সাংবাদিক খবর
করেছিলেন। মানবতার মৃত্যু হয় না। মানবতা ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় সংস্কৃতির অন্যতম
চালিকা শক্তি।




Comments
Post a Comment