কর্পোরেট শোষণের বিরুদ্ধে কৃষকদের মোর্চা গঠনের শপথ
দীপেন্দু চৌধুরী
কেন্দ্রের তিন বিতর্কিত কৃষি আইন বাতিলের দাবিতে গত এক বছরে
বেশ কয়েকবার ভারত বন্ধ হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের কোনও রকম উচ্চবাচ্চ নেই।মোদী সরকার
তারপরেও শীতঘুমে থাকতে চাইছে। সামনের বছর উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, পঞ্জাব সহ পাঁচ
রাজ্যে বিধানসভার ভোট। এই কয়েকটি রাজ্যে হিন্দুত্ব সম্প্রসারণবাদী দল বিজেপির কাছে
‘লিটমাস’ পরীক্ষা হবে। করণ উত্তরপ্রদেশের পশ্চিমাঞ্চল, পঞ্জাব ও হরিয়াণায় কৃষক আন্দোলনের
ব্যপক প্রভাব রয়েছে। এই সব রাজ্য মূলত কৃষক অধ্যুষিত রাজ্য।
২৭ সেপ্টেম্বর সংযুক্ত কিসান মোর্চার নেতৃত্বে ভারত বন্ধ ছিল।
সাধারণ মানুষের কষ্টের কথা ভেবে কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্ব বন্ধের সময়সীমা বিকেল চারটে
পর্যন্ত রেখেছিল। শৃঙ্খলাপরায়ণ শ্রেণির সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত আন্দোলনরত কৃষকরা, বন্ধ
সমর্থনকারী বিভিন শ্রমিক সংগঠন ভারতের বিভিন্ন রাস্তা থেকে চারটের সময় অবরোধ তুলে নেয়।
সংসদীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাসী শ্রমিক-কৃষক জোট দেশের মানুষকে বার্তা দিতে চেয়েছে, তাঁরা
মানুষের সুখ দুঃখের ভাগীদার। তাঁরা শুধু কৃষক নয় দেশের অন্নদাতা কৃষক।ওই একই সময়ে দিল্লি-গাজিয়াবাদ
সড়ক সহ দেশের প্রত্যেকটা রাজ্যের অবরোধ তুলে নেওয়া হয়। দিল্লি প্রবেশের অন্যতম রাস্তা
দিল্লি-মেরঠ এক্সপ্রেসওয়ে জ্যাম জটে স্তব্ধ হয়ে যায়। কয়েকশ কৃষকের মৃত্যুর পরেও প্রায়
এগারমাস ধরে কৃষকরা মনোবল অটুট রেখে আন্দোলন করছে। সংগঠিত কৃষকদের ধৈর্য এবং মনের শক্তি
দেখে এখন বলা যায় কৃষকরা ভারত বন্ধ করছে না।আইনের মারপ্যাচের সাহায্যে মোদী সরকার কৃষকদের
বন্দি করে রেখেছে। এই সরকার কৃষকদেরকেই নতুন আইনের খাঁচায় আটকে রেখেছে। সাম্প্রতিক
কালের একটি উদাহারণ থেকে এটা বুঝতে আমাদের সাহায্য করবে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে
কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রক দক্ষ ও বিশেষঞ্জদের নিয়ে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছিল। এই কমিটি গত পাঁচ মাস আগে
রিপোর্ট জমা দিলেও মোদী সরকার সেই রিপোর্ট জনসমক্ষে প্রকাশ করেনি। কমিটির রিপোর্ট ঠান্ডাঘরে
রেখে কর্পোরেট সংস্থার স্বার্থে আমলাতান্ত্রিক কৌশল অবলম্বন করেছে। সঙ্গে কৃষকদের ধৈর্যের
পরীক্ষা নিচ্ছে। বিশেষঞ্জ কমিটির অন্যতম সদস্য অনিল জয় সিংহ সুপ্রিম কোর্টের প্রধান
বিচারপতিকে চিঠি লিখে অনুরোধ করেছেন, কমিটির রিপোর্ট প্রকাশ্যে এনে সার্বজনীন করে দেওয়া
হোক। কৃষি মন্ত্রকের শম্বুকগতি চিনিয়ে দিচ্ছে ভারতীয় কৃষকদের প্রতি তাঁদের উপেক্ষা
করার কৌরব ঘরানার ঔদ্ধত্বের সংস্কৃতিকে। ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্র গত সাত বছর আদালতের
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছে।
চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি থেকে সরকার ও আন্দোলনকারী কৃষকদের মধ্যে
সবরকমের আলোচনা বন্ধ আছে। কেন্দ্রের অনমনীয় সিদ্ধান্ত, বিতর্কিত তিন কৃষি আইন বাতিল
করা হবে না। সংযুক্ত কৃষক মোর্চার নেতৃত্বের দাবি, আলোচনার প্রধান শর্তই হচ্ছে কর্পোরেট
সংস্থার স্বার্থে আনা উল্লেখিত তিন কৃষি আইন বাতিল করতে হবে। ২৭ সেপ্টেম্বর বন্ধের
দিন হিসেবে বেছে নেওয়ার অন্যতম কারণ ছিল, এক বছর আগে এই দিন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ
মোদী সরকারের আনা তিন কৃষি বিলে স্বাক্ষর করেছিলেন। ২৭ সেপ্টেম্বর ভারত বন্ধের আগে
সংযুক্ত কিসান মোর্চার নেতৃত্বে রেল অবরোধ, দিল্লি সীমান্ত সহ সারা দেশে ধর্না, বিক্ষোভ
কর্মসূচী পালিত হয়েছে। কৃষকরা ২৬ জানুয়ারি ‘কৃষক প্রজাতন্ত্র’ র্যালি করেছে। সংসদের
বাজেট অধিবেশনের সময় ‘কৃষক সংসদ’ বসিয়ে সরকারকে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে নিজেদের
প্রতিবাদ পৌঁছে দিয়েছিল। কৃষকদের আন্দোলনকে সমর্থন করে ‘কৃষক সংসদ’-এর অনুষ্ঠান মঞ্চে
কংগ্রেস নেতা তথা সাংসদ রাহুল গাঁধি সহ বিরোধী দলের বিভিন্ন নেতৃত্ব গেছেন। উত্তরপ্রদেশ,
হরিয়াণা সহ বিভিন্ন রাজ্যে কৃষক মহাপঞ্চায়েতের সাফল্য সারা দেশে ভারত বন্ধ করার শক্তি
যুগিয়েছে। ভারত বন্ধের দিন দিল্লি সীমান্তে জ্যাম জটের ছবি আমরা টিভির পর্দায় দেখেছি।দিল্লি-গাজিয়াবাদ
সীমান্তে প্রায় কয়েকঘণ্টা শয়ে শয়ে গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
বন্ধের দিন কৃষক নেতা রাকেশ টিকায়েত বলেছেন, ‘কৃষিমন্ত্রী নরেন্দ্র
সিং তোমর আমাদের বৈঠকে আহ্বান করেছেন। আমাদের যেতে আপত্তি নেই। কিন্তু তিনি বলছেন,
তিন কৃষি আইন বাতিল করা সম্ভব নয়। তা হলে আমরা বৈঠক করে কি করব? আমাদের কোনও জলদিবাজি
নেই। আরও এক বছর আন্দোলন করতে হলেও আমরা আন্দোলন করব।’ পোড় খাওয়া জাঠ কৃষকনেতা বুঝে
গেছেন সামনের বছর পাঁচ রাজ্যে বিধানসভার নির্বাচনের আগে মোদী সরকারকে একটা সিদ্ধান্ত
নিতেই হবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আমেরিকা সফরের সময় রাকেশ টিকায়েত মার্কিন
প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে ‘ট্যাগ’ করে আন্দোলনের প্রসঙ্গে একটা টুইট করেন। তাতে আমেরিকার
প্রেসিডেন্টকে অনুরোধ করেন, তিনি যেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদীকে ভারতীয় কৃষকদের সমস্যা,
আন্দোলন নিয়ে কথা বলেন। মোদীর সঙ্গে বাইডেনের দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় আফগানিস্তান, সন্ত্রাসবাদ,
বিশ্বঅর্থনীতি, কোভিড-১৯, জলবায়ু পরিবর্তন ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। যে খবর আমরা
সংবাদ মাধ্যম থেকে জানতে পেরেছি। কিন্তু বিশ্বের অন্যতম দক্ষ কূটনীতিবিদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট
জো বাইডেন ভারতের কৃষক আন্দোলন নিয়ে ভারতকে কোনওরকম বার্তা দিয়েছেন কিনা সেটা জানা
যায়নি। আমেরিকার সংবাদ মাধ্যম থেকে জানা গেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছেন, ভারতের সংবাদ
মাধ্যম খুব ভদ্র এবং তাঁদের ‘শালীনতা’-বোধ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। আগ্রহী ও মনোযোগী পাঠকদের
বলে দিতে হবে না নিশ্চয় জো বাইডেন কি ইঙ্গিত করতে চেয়েছেন।
সংযুক্ত কিসান মোর্চার ডাকে ২৭ সেপ্টেম্বরের দিন দেশের বিভিন্ন
রাজ্যে জীবনযাত্রা অচল হয়ে যায়। সরকার বিরোধী শ্রমিক সংগঠনগুলির সমর্থনে উত্তর থেকে দক্ষিণ ভারতের
বিভিন্ন রাজ্যের শহর গঞ্জে রাস্তা-রেল অবরোধ, বিক্ষোভ সমাবেশ হয়। উল্লেখযোগ্যভাবে দেশের
শিল্পাঞ্চল ও শিল্পনগরীগুলিতে ব্যপক প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। ‘গোদী মিডিয়া’ বন্ধ ব্যর্থ
দেখাতে চাইলেও ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম অ্যাপের মাধ্যমে অবস্থান, অবরোধের ছবি
ছড়িয়ে পড়েছে। কৃষকদের ডাকা বন্ধ সমর্থন করে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করতে দেখা গেছে কেন্দ্র
বিরোধী সব দলকে। ২৩টি রাজ্যে বন্ধের সর্বাত্বক বা আংশিক প্রভাব পড়েছে। কোনও কোনও রাজ্যে
মিশ্র সাড়া পাওয়া গেছে। কয়েকটি রাজ্য যেমন কেরালা, পঞ্জাব, হরিয়ানা, বিহার, ঝাড়খন্ড,
রাজস্থানে জীবনযাত্রা পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে যায়। পঞ্জাবের লুধিয়ানা, পাতিয়ালা, ভাতিন্ডা,
জলন্ধর, ফিরোজপুর, মেগা ও অমৃতসরে বন্ধ সম্পূর্ণ সফল। দোকান-বাজার, কল-কারখানা কোনও
কিছুই খোলা ছিল না। পঞ্জাবে বন্ধের দিন রাজ্য জুড়েই দোকান-বাজার বন্ধ ছিল।ওই রাজ্যের
৫০০ জায়গায় বিক্ষোভ ও অবরোধ হয়েছে।
পঞ্জাবের মতই হরিয়ানাতেও বন্ধ সফল। হরিয়ানার সরকারি অফিসে কাজও
বন্ধ ছিল। পঞ্জাব-হরিয়ানা এই দুই রাজ্যে বন্ধের দিন জাতীয় সড়ক, রাজ্য সড়ক ও রেললাইনে
অবরোধ চলতে থাকায় উত্তর ভারতের যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। উত্তরপ্রদেশের
বিভিন্ন অংশে বন্ধ সফল হয়েছে। বিশেষত পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের ছবি ছিল ছোটা হিন্দু সম্রাট
যোগী সরকারকে ধাক্কা দেওয়ার ছবি।পঞ্জাব, হরিয়ানা ও উত্তরপ্রদেশে অবরোধের কারণে রাজধানী
দিল্লিতে দদীর্ঘক্ষণ কোনও যানবাহনই ঢুকতে পারেনি।কয়েকটি ট্রেন বন্ধ হয়ে যায়। বাতিল
করা হয় দূর পাল্লার ট্রেন। ২৭ সেপ্টেম্বর বন্ধের দিন প্রধানমন্ত্রী মোদীর সংসদীয় কেন্দ্র
বারাণসীতে হাজার হাজার মানুষ বন্ধের সমর্থনে বিক্ষোভ দেখায়। কৃষিমন্ত্রী নরেন্দ্র সিং
তোমরের কেন্দ্র মোরোনায় সর্বাত্বক বন্ধ হয়েছে। কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল জম্মুতে প্রবীণ সিপিএম
নেতা মহম্মদ ইউসুফ তারিগামির নেতৃত্বে তিন কৃষি আইন প্রত্যাহারের দাবিতে সারাদিন আন্দোলন
হয়েছে।রাজ্যের প্রধান সড়কে ধরনায় বসেছিলেন কৃষকরা।
এই বছরের সেপ্টেম্বর মাসের সফল বন্ধের পরে কৃষক নেতারা দাবি
করেছেন, কর্পোরেট শোষণের বিরুদ্ধে জনগণের বৃহত্তর মোর্চা গঠনের রাস্তার সন্ধান পাওয়া
গেছে। এই রাস্তা ধরেই শ্রমিক-কৃষক, ছাত্র-যুবক, সরকারি কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে আগামী দিনে
আন্দোলন আরও জোরদার করা হবে। তাঁদের দাবি, কৃষক বিরোধী তিন কৃষি আইন বাতিল না করা পর্যন্ত
কৃষক আন্দোলন চলবে। সরকার আমাদের মনোবল ভাঙতে চাইছে। আমরা চেতাবনী দিচ্ছি সরকারকে। আমলাদের সাহায্যে শ্রমিক-কৃষক জোট ভাঙা যায়নি। ভবিষ্যতেও
ভাঙা যাবে না।
Comments
Post a Comment