বাংলার মহামানবের তীরে সবান্ধব আমন্ত্রণ
দীপেন্দু চৌধুরী
এই উপত্যকা আজও রবীন্দ্র উপাসক। এই উপাত্যকা আজও ব্রাহ্ম সঙ্গীতের উপাসক,
ধ্রুপদী সাহিত্য সঙ্গীত, চলচ্চিত্র, সামাজিক মাধ্যমের পৃষ্ঠপোষক। আমরা রামমোহন,
বিদ্যাসাগর, বিবেকানন্দ, বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্র, নজরুলের অনুরাগী। সামাজিকতায়
বহুজনের আসন বিছিয়ে বাংলা তথা বাঙালি দুয়ার খুলে বসে আছে। বহুত্ববাদের প্রশ্রয়ী
স্পর্ধায় সজাগ আছে বাংলা। ভালোবাসায়, অনুভবে, অনুরণনে। হাজার হাজার বছরের
বহুগোষ্ঠী বহুজন সংস্কৃতির আপ্যায়নে অভ্যস্ত পদচিহ্ন আজও বিভক্ত বাংলায় জ্বল জ্বল
করছে। বহুত্ববাদের
জনপদে আমরা হেটে চলেছি কয়েক হাজার বছর
ধরে। অবিভক্ত বাংলার পদচিহ্ন ছুঁয়ে ছুঁয়ে ধ্রুপদী মূল্যবোধের
প্রভাতি সঙ্গীতের জন্য আজও আমরা কান পেতে থাকি।
আপনাদের উদ্দ্যেশ্য বিধেয় আমরা জানি। ভারতীয় গণতন্ত্রের যুক্তরাষ্ট্রীয়
কাঠামোয় কতগুলি মৌলিক অধিকার সব নাগরিকের আছে। রাজনৈতিক দলের আছে। সামাজিক এবং
রাজনৈতিক নেতার অধিকার আছে, গণতন্ত্রের চর্চা করার। কিন্তু গণতন্ত্র যদি বহুজন
সংস্কৃতি বিচ্যুত হয়। ভঙ্গুর হয়, ধ্রুপদী সমাজ অনুমোদন করে না। মান্যতা দিতে এবং
মান্যতা পেতে অসুবিধা হয় না কি? কেউ বলছে, বাংলার বুদ্ধিমান মানুষ চুপ করে আছে।
কেউ বলছে বাংলার সুশীল সমাজ হারিয়ে গেছে। সত্য কিন্তু তেমন বলছে না। বুদ্ধিমান
মানুষ চর্চিত বুদ্ধির সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে জানে। শুধুমাত্র সময়ের অপেক্ষা।
আপনারা বাংলায় আসছেন। আসুন। আপনাদের রুচি, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস
প্রভৃতি নিয়ে। বহুত্ববাদের প্রশ্রয়ী স্পর্ধায় সজাগ আছে বাংলা। কোথায় শুরু করতে হবে
কোথায় থামতে হবে রবীন্দ্র উপাসক বাঙালি জানে। বিবেকানন্দের বাংলা জানে। আজ আপনাদের
মনে করিয়ে দিতে কোনও উপাখ্যান লিখতে চাইছি না। আপনাদের কথন এবং বহু কথন থেকে চয়ন
করে কয়েকটি কথা বলে ফেলতে চাইছি। মার্জনা করে দেবেন ভারতীয় উদার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য
মেনে।
চলতি মাসের ২০ ডিসেম্বর দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ শান্তিনিকেতন
ঘুরে গেলেন। শান্তিনিকেতন আসার আগে থেকেই বিজেপি তাদের নিজস্ব ঘরানায় প্রচার শুরু
করে দিয়েছিল। বোলপুর-শান্তিনিকেতন রাস্তায় বড় বড় হোর্ডিং লাগানো হয়েছিল।
হোর্ডিং-য়ের ছবির উপরে বড় সাইজের অমিত শাহের ছবি তার নিচে ছোট আকারে রবীন্দ্রনাথের
পেন্সিল স্কেচ ছবি। তার নিচে স্থানীয় এক বিজেপি নেতার উজ্জ্বল ছবি। দু’জনের চাপে রবীন্দ্রনাথ
পিষ্ঠ হয়ে গিয়েছেন। কবিগুরুকে এতটাই তাচ্ছিল্য করতে চাইছে তারা। যদিও পরে প্রতিবাদের
ঝড় ওঠায় ওই হোর্ডিং বিজেপি থেকে খুলে ফেলা হয়। বিশ্বভারতী প্রাক্তনী সংসদ তীব্র
প্রতিবাদ জানিয়ে রাস্তায় নামে। এই ধরণের প্রচার কলকাতা শহরেও দেখা গেছে তৃণমূল
সরকারের উদ্যোগে। ২৫ বৈশাখ রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনের অনুষ্ঠান রবীন্দ্রসদন প্রাঙ্গণ
জুড়ে হয়। সেই অনুষ্ঠানের হোর্ডিং-য়ের ছবিতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা
বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি থাকে বড় করে, তার নিচে কিঞ্চিৎ ছোট সাইজের ছবি দেওয়া হয়
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। তুলনামূলক আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে ২৫ বৈশাখ রবীন্দ্রসদনের
হোর্ডিং-য়ের বিষয়টা উল্লেখ করতে বাধ্য হলাম।
ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর শান্তিনিকেতন সফরকে কেন্দ্র করে একাধিক রাজনৈতিক
বিতর্ক উঠেছে। যেমন বিজেপি নামক একটি রাজনৈতিক
দলের পতাকায় ছেয়ে ফেলা হয়েছিল শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী ক্যাম্পাস। রবীন্দ্রনাথের
শান্তিনিকেতনে এই ঘরানার সংস্কৃতি ইতিপূর্বে বাংলার মানুষ দেখেনি। ৩৪ বছরের
বামফ্রন্ট সরকারের আমলে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের ভেতরে কোনওদিন
একটিও দলীয় পতাকা টানানো হয়েছে এমনটা কেউ মনে করতে পারছেন না। সিপিএমের অতি
নিন্দুকেরাও মনে করতে পারছেন না। প্রায় ১০ বছর বাংলার শাসন ব্যবস্থায় আছে
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার।
বিশ্বভারতী ক্যাম্পাসে তৃণমূল কংগ্রেস কোনওদিন দলীয় পতাকা টানাইনি। কংগ্রেস
সরকারের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু, ইন্দিরা গাঁধী এবং রাজীব গাঁধী একাধিক
অনুষ্ঠানে শান্তিনিকেতনে এসেছেন। প্রদেশ
কংগ্রেসের প্রবীণ নেতৃত্ব মনে করতে পারছেন না, যে কংগ্রেস দলের কোনও পতাকা সেই সব
অনুষ্ঠানে টানান হয়েছে। তাদের দাবি, প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠান মানে তো কেন্দ্রীয়
সরকারের অনুষ্ঠান। সেখানে দলীয় পতাকা থাকবে কেন? কংগ্রেস এই সংস্কৃতির ঘরানায়
বিশ্বাস করে না।
তিন বছর আগের একটি ঘটনা আমাদের মনে আছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র
মোদী আচার্য হিসেবে শান্তিনিকেতনে এসেছিলেন। আম্রকুঞ্জের অনুষ্ঠানে ‘জয় শ্রী রাম’
এবং ‘মোদী মোদী’ ধ্বনি তোলা হয়। সম্প্রতি রবীন্দ্র অনুরাগী হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ভোটমুখী বাংলায়
২৪ ডিসেম্বর বিশ্বভারতীর শতবর্ষ অনুষ্ঠানে ভার্চুয়াল বক্তৃতা দিলেন মোদী। সেই
ভাষণকে কেন্দ্র করেও কিছু বিতর্ক উঠেছে। বিশ্বভারতীর প্রাক্তন উপাচার্য তথা ইতিহাসবিদ
রজতকান্ত রায় বলেছেন, ‘’প্রধানমন্ত্রী মুখে রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে ‘আত্মনির্ভর’
ভারতের মন্ত্র ধার করার কথা বলছেন। কাজের বেলায় তিনিই বিশ্বভারতীতে কেন্দ্রীয়
অনুদানে স্বাধীন সংস্কারকাজ এক রকম বন্ধ করে দিয়েছেন।‘’ বছর তিনেক আগেও তার মুখে
রবীন্দ্রনাথের নাম শোনা যায়নি। রাজনৈতিক উদ্দ্যেশ নিয়ে বিজেপি দলের প্রধান
নরেন্দ্র মোদী এবং তাঁর দক্ষিণহস্ত অমিত শাহ বাংলার মনীষীদের ব্যবহার করতে চাইছেন।
বামপন্থী দলের থেকেও প্রতিবাদ উঠে আসছে। সিপিআই (এমএল) লিবারেশন দলের রাজ্য
সভাপতি পার্থ ঘোষ একটি বিবৃতিতে জানিয়েছেন, বাংলার উদার মানবতাবাদী বহুত্ববাদী,
আধুনিক প্রগতিশীল চিন্তাধারার বিপরীতে সাভারকারের ভাবশিষ্যদের মতাদর্শকে চাপিয়ে
দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে। কলকাতা, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় দখল সম্ভব হয়নি। তাই
রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত বিশ্বভারতী দখলের অভিযান শুরু করেছে বিজেপি। আসমান
সমান উঁচু একজন মানুষ পথে দাঁড়িয়ে আছেন।
তাঁর সংস্কৃতি, ঐতিহ্য রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সকলের।
বিশ্বভারতী তথা রবিঠাকুরের
শান্তিনিকেতনের আলাদা একটা ঐতিহ্য আছে। যেটা বাংলার গর্ব, আপামর বাঙালির গর্ব।
ভারতের গর্ব এবং সারা বিশ্বের অহংকার। তাই শান্তিনিকেতন চত্বরকে কলুষিত করার
অধিকার কাউকে দেওয়া যায় না। শুধু একটি মাত্র ঘটনা নয়। অমিত শাহের সঙ্গে বিজেপির
একঝাঁক নেতৃত্বকে বিশ্বভারতী চত্বরে হৈ হৈ করে ঢুকে পড়তে দেখা গেছে সেদিন। যেন কোনও রাজনৈতিক সভা
আছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শান্তিনিকেতনে একটি পুরনো রাস্তার নতুন নামকরণ করে
উদ্বোধন করেন। সেই রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে স্বামী
বিবেকানন্দের নামে। হঠাৎ শান্তিনিকেতন প্রাঙ্গণে বিবেকানন্দের নামে রাস্তা কেন?
এটি কোনও আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি একটি সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ। সংঘ পরিবার এখন সুকৌশলে
রবীন্দ্রনাথের বিপরীতে বিবেকানন্দকে স্থাপন করতে চাইছে। সংঘ পরিবার বেশ কিছুদিন
ধরে বিবেকানন্দকে এক আগ্রাসী হিন্দু সন্ন্যাসীরূপে চিহ্নিত করতে চাইছে। সকলের
নিশ্চয় মনে আছে আদবানির রথযাত্রার সময় ওই রথে বিবেকানন্দের কাটআউট লাগানো থাকতো।
আর এখনতো অনেক বিজেপি নেতা বিবেকানন্দের সংসার জীবনের নাম উল্লেখ করে (নরেন্দ্রনাথ
দত্ত) তাঁকে নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে তুলনা করে থাকে। বাংলার মনীষীদের যে ভাবে
রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে চাইছে বিজেপি, তাতে বাংলার বহুত্ববাদী সংস্কৃতির
ভাবমূর্তিতে কালিমালিপ্ত করা হচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকেই।
শোনা যাচ্ছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ফের ভোটমুখী বাংলায় সফরে আসছেন।
সম্ভবত ১২ জানুয়ারি তিনি কলকাতা হয়ে বেলুড় মঠে যাবেন। সেদিন
বিবেকানন্দের জন্মদিন। সেখানে তাঁর কি রাজনৈতিক পরিকল্পনা আছে সেটা আগাম আঁচ করে
বলা সম্ভব নয়। তবে অতীত মনে রেখে বলতে হয় তাঁর মন্ত্রগুরু নরেন্দ্র মোদীর পথই অনুসরণ
করবেন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বছর খানেক আগে প্রধানমন্ত্রী পশ্চিমবঙ্গে এসে
বেলুরমঠে রাত্রিবাস করেছিলেন। বিবেকানন্দের জন্মদিনকে উপলক্ষ করে মঠের একটি
অনুষ্ঠান মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী মোদী ভারতের সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ)-র প্রসঙ্গ
তুলেছিলেন। বিষয়টা নিয়ে সারা দেশে বিতর্কের ঝড় উঠেছিল। বেলুড় মঠের অনুষ্ঠান মঞ্চকে
ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিক উদ্দ্যেশ্যে ব্যবহার করতে পারেন কী ? অবশেষে বেলুড়
মঠ কতৃপক্ষ বিবৃতি দিয়ে বলে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী মঠের অতিথিশালায় রাত্রিবাস করার
কথা জানালে আমরা আপত্তি করতে পারি না। আর তিনি কি বলবেন সেটা আমরা কি করে জানব?
সংকীর্ণ রাজনৈতিক উদ্দ্যেশ্যে বিবেকানন্দকে নিয়ে যে প্রচার বিজেপি করছে সে
প্রসঙ্গে বলা যায়, স্বামীজি নিজে কি জানতেন তাকে একটি হিন্দুত্ববাদী দল রাজনৈতিক
উদ্দ্যেশ্যে ব্যবহার করবে? বিবেকানন্দ বলেছিলেন, ‘হে বীর সাহস অবলম্বন কর, সদর্পে
বল’, ‘’আমি ভারতবাসী, ভারতবাসী আমার ভাই। বল মূর্খ ভারতবাসী, দরিদ্র ভারতবাসী,
চন্ডাল ভারতবাসী আমার ভাই। তুমিও কটিমাত্র বস্ত্রাবৃত হইয়া সদর্পে ডাকিয়া বল-
ভারতবাসী আমার ভাই, ভারতবাসী আমার প্রাণ, ভারতের দেবদেবী আমার ঈশ্বর, ভারতের সমাজ
আমার শিশুশয্যা, আমার যৌবনের উপবন, আমার বার্ধক্যের বারাণসি, বল ভাই- ভারতের
মৃত্তিকা আমার স্বর্গ, ভারতের কল্যাণ আমার কল্যাণ।‘’





Comments
Post a Comment